ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির স্মরণে রাজধানী তেহরানে শুরু হয়েছে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান। এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অটুট রাখার পাশাপাশি তার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন দেশটির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা।রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত এই শোকানুষ্ঠানে রাজধানীর গ্র্যান্ড মোসাল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে হাজারো মানুষের ঢল নামে। শনিবার ভোর থেকেই শোকাহত জনতা খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন। কাচে আবৃত কফিনটি একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হয় এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) সদস্যরা কঠোর নিরাপত্তায় তা পাহারা দেন।শোকানুষ্ঠানে সর্বত্র লাল পতাকা ও কালো ব্যানার শোভা পায়। শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্যে লাল পতাকা শাহাদাত ও প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এবারের কর্মসূচির মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘আমাদের অবশ্যই জেগে উঠতে হবে।’রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, তেহরানের বিভিন্ন মেট্রো স্টেশন ও সমাবেশস্থলে অংশগ্রহণকারীরা ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ এবং ‘ইসরাইল ধ্বংস হোক’ স্লোগান দিচ্ছেন। শোকসভায় অংশ নেওয়া ফাতিমা নামের এক নারী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা আমাদের নেতার রক্তের ঋণ শোধ করতে এবং তার হত্যার প্রতিশোধের অঙ্গীকার নিয়েই এখানে এসেছি।’তিনি আরও বলেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে বিপ্লবের পথচলা অব্যাহত থাকবে।খামেনি হত্যাকাণ্ডের পর গত মার্চে একটি ধর্মীয় কাউন্সিল তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করে। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি এ শোকানুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না।কঠোর নিরাপত্তায় রাজধানীশোকানুষ্ঠানকে ঘিরে তেহরানজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে সাঁজোয়া যান, ভারী অস্ত্রধারী নিরাপত্তা বাহিনী ও স্নাইপার। মোসাল্লায় প্রবেশের আগে দর্শনার্থীদের দেহ তল্লাশি করা হচ্ছে এবং পাওয়ার ব্যাংক, ইয়ারফোন ও লাইটারের মতো বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রী জব্দ করা হচ্ছে।তীব্র গরমের মধ্যে অংশগ্রহণকারীদের জন্য রাজধানীজুড়ে হাজার হাজার অস্থায়ী ধর্মীয় সেবা কেন্দ্র (মোকেব) স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বিনামূল্যে খাবার, পানীয়, চিকিৎসাসেবা ও শীতলীকরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।দেশজুড়ে শোকের আবহসরকারি হিসাবে, সোমবার পর্যন্ত কার্যত পুরো ইরান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় এক কোটি মানুষের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাজধানীর বড় অংশে বেসরকারি যান চলাচল সীমিত করা হয়েছে।আগামী সোমবার তেহরানে খামেনির জানাজার শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তার মরদেহ শিয়াদের পবিত্র শহর কোম, নাজাফ ও কারবালা হয়ে আগামী বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদে দাফন করা হবে।এদিকে সরকারি ছুটি কাজে লাগিয়ে অনেক নাগরিক তেহরানের প্রচণ্ড গরম ও জনসমাগম এড়াতে কাস্পিয়ান সাগর-সংলগ্ন উত্তরাঞ্চলে চলে যাওয়ায় তেহরান-শুমাল মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।প্রতিশোধের হুঁশিয়ারিযুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসে আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদি বলেন, খামেনির প্রতি এমনভাবে শ্রদ্ধা জানাতে হবে, যাতে শত্রুরা ইরানের আত্মসমর্পণের আশা নিয়েই পরাজিত হয়। একই অনুষ্ঠানে আইআরজিসির অ্যারোস্পেস প্রধান মজিদ মুসাভিও উপস্থিত ছিলেন।অন্যদিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সম্প্রতি মোজতবা খামেনিকে ‘মৃত্যুর তালিকায়’ থাকার দাবি করলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর অনুষ্ঠানের সময় যেকোনো সামরিক উসকানির বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে।বিদেশি প্রতিনিধিদের শ্রদ্ধাশোকানুষ্ঠানে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এছাড়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ, ভারতের প্রতিনিধি দল, চীনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকিসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।এ ছাড়া ফিলিস্তিনের হামাস এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।সূত্র: আল জাজিরা ও এএফপি