টানা ৩৬ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর অবশেষে প্রাণে বাঁচলেন শ্রীলঙ্কার দুই জেলে—একজন বাবা ও তার ছেলে। বঙ্গোপসাগরে ভাসতে থাকা তাদের বিকল মাছ ধরার ট্রলারটি দেখতে পেয়ে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন কক্সবাজারের মহেশখালীর একদল বাংলাদেশি জেলে। পরে তাদের নিরাপদে উপকূলে এনে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।উদ্ধার হওয়া দুই শ্রীলঙ্কান নাগরিক হলেন এস এইচ চামিন্দা এবং তার ছেলে সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং। তাদের বাড়ি শ্রীলঙ্কার ডেভিনুওয়ারা এলাকার রুরাল হসপিটাল রোডে।জানা যায়, গত ১৯ জুন চারজন জেলে মাছ ধরতে সমুদ্রে যান। একপর্যায়ে তাদের ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। তখন দুই জেলে অন্য একটি ট্রলারে চলে যেতে সক্ষম হলেও চামিন্দা ও তার ছেলে নিজেদের ট্রলারটি ফেলে যেতে রাজি হননি। ফলে তারা বিকল ট্রলারেই ভেসে থাকতে থাকেন। স্রোতের টানে ট্রলারটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার দিকে চলে আসে।গত বুধবার রাতে বঙ্গোপসাগরের গুলিরধার এলাকায় মাছ ধরার সময় কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের জেলে জিয়াউর রহমান দূরে একটি ট্রলার ভাসতে দেখেন। কাছে গিয়ে তিনি দেখতে পান, ট্রলারে থাকা দুই ব্যক্তি চরম দুর্বল অবস্থায় সাহায্যের জন্য হাত নাড়ছেন। ভাষা না বুঝলেও তারা বারবার নিজেদের ‘শ্রীলঙ্কান’ বলে পরিচয় দেন।জিয়াউর রহমান জানান, দুই জেলেকে উদ্ধার করে নিজের ট্রলারে তোলার পাশাপাশি তাদের বিকল ট্রলারটিও দড়ি দিয়ে বেঁধে উপকূলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। প্রায় ১৪ ঘণ্টার যাত্রা শেষে বৃহস্পতিবার সকালে তারা উপকূলে পৌঁছান।উদ্ধারের পর দুই শ্রীলঙ্কান জেলেকে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি দেওয়া হয়। তারা জানান, দীর্ঘদিন সাগরে ভেসে থাকার একপর্যায়ে খাবার ফুরিয়ে যাওয়ায় জীবিত থাকতে কাঁচা মাছ খেতে বাধ্য হয়েছেন।উপকূলের কাছাকাছি এসে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া গেলে জিয়াউর রহমানের সহায়তায় হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তারা শ্রীলঙ্কায় থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে স্থানীয় থানা ও কোস্টগার্ডকে বিষয়টি জানানো হয়।সেদিন রাতে দুই জেলেকে জিয়াউর রহমান নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয় এবং স্থানীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসাও দেওয়া হয়।মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুস সুলতান জানান, দোভাষীর সহায়তায় দুই জেলের সঙ্গে কথা বলে পুরো ঘটনা জানা যায়। পরে বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবস্থিত শ্রীলঙ্কান দূতাবাসকে অবহিত করা হয়।ওসি জানান, শ্রীলঙ্কার হাইকমিশনার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং দুই জেলেকে দ্রুত নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তাদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ঢাকায় পাঠানো হবে। প্রয়োজনীয় ট্রাভেল ডকুমেন্ট প্রস্তুত হওয়ার পর তাদের শ্রীলঙ্কায় ফেরত পাঠানো হবে।এদিকে উদ্ধার হওয়া ট্রলারটি বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। তবে শ্রীলঙ্কান বাবা-ছেলে তাদের প্রাণরক্ষাকারী বাংলাদেশি জেলে জিয়াউর রহমানকে কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে ট্রলারটি উপহার দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, আদালতের প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।এই মানবিক ঘটনাটি দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।