চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের জনপ্রিয় শিল্পী শেফালী ঘোষের সেই বিখ্যাত গান—‘যদি সুন্দর একটা মুখ পাইতাম, বাঁশখালীর পানর খিলি তারে বানাই খাওয়াইতাম’—বাঁশখালীর পানের ঐতিহ্য ও সুখ্যাতিরই প্রতিচ্ছবি। সেই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পান এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার জানান, বাঁশখালীতে মূলত বাংলা ও মিষ্টি—এই দুই ধরনের পান চাষ হয়। চলতি মৌসুমে উপজেলার ১৪০ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে। পুঁইছড়ী, নাপোড়া, চাম্বল, শীলকূপ, জলদী, বৈলছড়ী ও কালীপুরসহ সাধনপুর ও পুকুরিয়ার বিভিন্ন পাহাড়ি উর্বর জমিতে গড়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন পানের বরজ। এসব বরজ দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরাও আসেন।উপজেলার সবচেয়ে বড় পানের হাট বসে পুঁইছড়ীর মিয়া হাটে। প্রতি শুক্রবার ও রোববার বসা এ হাটে সন্ধ্যার পর থেকেই পাহাড়ি এলাকার চাষিরা পান নিয়ে আসতে শুরু করেন। গভীর রাত পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। বর্তমানে আকারভেদে প্রতি জোড়া (দুই বিরা) পান ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।তবে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বহু পানের বরজ তলিয়ে যাওয়ায় চাষিরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। পূর্ব-পুঁইছড়ির পানচাষি হেলাল ও নাপোড়ার মমতাজ উদ্দিন জানান, মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বরজ তৈরি করলেও বন্যার পানিতে সব নষ্ট হয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।পুঁইছড়ি পানচাষি সমবায় সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম জানান, এলাকায় আট শতাধিক পানচাষি রয়েছেন। এক কানি জমিতে নতুন বরজ তৈরি থেকে শুরু করে পান বিক্রি পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সেখান থেকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা লাভ করা সম্ভব। তবে অতিবৃষ্টি পানের আবাদে বড় ঝুঁকি। এবারের বন্যায় অনেক বরজ নষ্ট হওয়ায় চাষিদের আর্থিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে।সাধনপুরের চাষি বশির আহমেদ জানান, মাঝেমধ্যে পাহাড়ি হাতির পাল এসে পানের বরজ তছনছ করে দেয়। এতে ক্ষতি হলেও চাষিরা সরকারি সহায়তা পান না বলে অভিযোগ করেন তিনি।চাম্বলের প্রায় ৯০০ সদস্যের পানচাষি সমিতি ও অন্যান্য চাষিরা জানান, পানের স্থায়িত্ব মাত্র ২ থেকে ৩ দিন। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় সময়মতো বিক্রি করতে না পারলে লোকসান গুনতে হয়। এ কারণে পান সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা, চাষিদের প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন তারা।পুঁইছড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তারেকুর রহমান বলেন, কৃষকদের সরকারি খাসজমি ইজারা দেওয়ার পাশাপাশি ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে পানচাষে তারা আরও উৎসাহিত হবেন।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, পান চাষ বাড়াতে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পানচাষিদের তালিকা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।