এসএসসির ফল ও ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, ২৩ সেপ্টেম্বর ক্লাস শুরুর পরিকল্পনা; ২০২৮ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতির সময় কমার আশঙ্কাদেশের শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ১ জুলাই। কিন্তু চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে একাদশের ক্লাস শুরু হচ্ছে প্রায় তিন মাস পর। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর ক্লাস শুরুর পরিকল্পনা থাকায় কার্যত সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরতে হবে।এদিকে আগামী বছরগুলোতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। ফলে চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা ২০২৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সময় ক্লাস ও পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তুলনামূলক কম সময় পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।ফল প্রকাশে রেকর্ড বিলম্ব, ভর্তিতেও দীর্ঘসূত্রতাচলতি বছর এসএসসি ও সমমানের ফল ২০ জুলাইয়ের মধ্যে প্রকাশের কথা থাকলেও তা প্রকাশ করা হয় ১০ আগস্ট। ২০ বছরের মধ্যে এবারই ফল প্রকাশে সবচেয়ে বেশি সময় লেগেছে—পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৮২ দিন পর ফল প্রকাশ হয়।ফল প্রকাশের ২২ দিন পর, ২ সেপ্টেম্বর একাদশে ভর্তির আবেদন শুরু হয়েছে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তির আবেদন নেওয়া হবে। পুনর্নিরীক্ষণে ফল পরিবর্তন হওয়া শিক্ষার্থীরা ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর আবেদন করার সুযোগ পাবে।কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে ১৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায়। নির্বাচিতদের ভর্তি নিশ্চায়নের সময় ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত। এরপর ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর ভর্তি কার্যক্রম চলবে। সব প্রক্রিয়া শেষে ২৩ সেপ্টেম্বর একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।আগের বছরগুলোর তুলনায় এবারও পিছিয়ে ক্লাসকরোনাভাইরাস মহামারির আগে একাদশ শ্রেণির ক্লাস সাধারণত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই শুরু হতো। ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ১ জুলাই ক্লাস শুরু হয়েছিল।মহামারির পর শিক্ষাপঞ্জিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ২০২০ সালে ৪ অক্টোবর অনলাইনে একাদশের ক্লাস শুরু হয়। ২০২১ সালের ক্লাস শুরু হয় ২০২২ সালের ২ মার্চ এবং ২০২২ সালের ক্লাস শুরু হয় ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি।পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও স্বাভাবিক সময়সূচিতে ফেরা সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সালে ৮ অক্টোবর, ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের কারণে ২১ জুলাইয়ের পরিবর্তে ১১ আগস্ট এবং ২০২৫ সালে ১৫ সেপ্টেম্বর একাদশের ক্লাস শুরু হয়েছিল।চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষা কিছুটা এগিয়ে নেওয়া হলেও একাদশের ক্লাস শুরুর সময় আরও পিছিয়ে যাচ্ছে।শিক্ষাপঞ্জি নিয়ে প্রশ্নশুধু একাদশের ক্লাস নয়, বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাকার্যক্রমেও সময়সূচির ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা গত বছরের ডিসেম্বরে হওয়ার কথা থাকলেও তা অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২৬ সালের এপ্রিলে। ফলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে প্রায় চার মাস পড়াশোনার পর শিক্ষার্থীদের পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের ওপর বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, শিক্ষাপঞ্জি অতীতের তুলনায় খুব বেশি এলোমেলো হয়নি। বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন ও নতুন পরিকল্পনার কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী সব কার্যক্রম শৃঙ্খলায় ফিরবে বলে আশা করছেন তিনি।এদিকে বন্যা পরিস্থিতির কারণে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষাও পিছিয়েছে। এর ফলে ফল প্রকাশ নভেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ১৪ মার্চ নির্ধারণ করা হয়েছে।প্রস্তুতির সময় কমার আশঙ্কা শিক্ষার্থীদেরএকাদশে ক্লাস দেরিতে শুরু হওয়া এবং ভবিষ্যতে এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আনার পরিকল্পনায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির সময় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।এ বছর মতিঝিল বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী শাকিব শাহরিয়ার বলেন, ফল প্রকাশে দেরির পর ভর্তি প্রক্রিয়াতেও বিলম্ব হচ্ছে। ক্লাস শুরু হতে সেপ্টেম্বরের শেষ হয়ে যাবে। অথচ এইচএসসি পরীক্ষা যদি এপ্রিলে এগিয়ে আনা হয়, তাহলে তাদের প্রস্তুতির জন্য অন্য ব্যাচের তুলনায় প্রায় তিন মাস কম সময় থাকবে। এতে মাত্র ১৬ থেকে ১৭ মাস প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় বসার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন অভিভাবকেরাও। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মূল শাখার এক শিক্ষার্থীর মা অন্তরা পারভীন বলেন, পরীক্ষা এগিয়ে আনা হলে ক্লাস শুরুর সময়ও এগিয়ে আনা উচিত। দেরিতে ক্লাস শুরু হলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।শিখন ঘাটতির আশঙ্কাব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ মনে করেন, শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে দ্রুত পরীক্ষা নেওয়া হলে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি তৈরি হতে পারে।তার মতে, শিক্ষাপ্রশাসনের অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা কতদিন ক্লাস করেছে বা কতটা শিখেছে, তার চেয়ে দ্রুত শিক্ষাবর্ষ শেষ করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে ফল বিপর্যয় ঘটতে পারে এবং ভালো শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।তিনি বলেন, স্বাভাবিক শিক্ষাপঞ্জিতে ফিরতে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। হঠাৎ পরীক্ষা এগিয়ে আনলে অন্তত এক বা দুটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।‘তিন মাসের ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব’তবে একাদশে ক্লাস শুরুর প্রায় তিন মাসের বিলম্বকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছে না শিক্ষা বোর্ডগুলো।বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ভর্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে আনা হয়েছে। ফলে যে সময়টুকু দেরি হচ্ছে, তা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।তিনি জানান, ২০২৭ সালে ৬ জুন এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৮ সালে পরীক্ষা আরও কিছুটা এগিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে।২০২৮ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একাদশে ভর্তি হওয়ার পর তাদের হাতে প্রায় ২০ থেকে ২২ মাস সময় থাকবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্লাস ও পরীক্ষা পরিচালনা করা গেলে এই সময়ের মধ্যেই পাঠ্যক্রম শেষ করা সম্ভব হবে। শিক্ষার্থীরাও দীর্ঘ সময় হাতে রেখে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাবে।