বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: এখনই সময় নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর ; ড. মাহরুফ চৌধুরীএকটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তন করা যায় না, কিন্তু চাইলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সেটাকেসুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা যায় এবং সেই অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করা যায়। যে রাষ্ট্র তারভৌগোলিক অবস্থানের কৌশলগত গুরুত্ব বুঝতে পারে, সে রাষ্ট্র উন্নয়ন, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও কূটনীতিরনতুন পথ আবিষ্কার করে। আর যে রাষ্ট্র তা পারে না, সে অন্যদের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের উপকরণেপরিণত হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘বাস্তববাদী’ দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায় যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাও সমৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করে তার অবস্থান, সংযোগ এবং কৌশলগত সক্ষমতার ওপর।বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এমন একভূগোল, যা সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে আমাদের দেশেটি আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন,সরবরাহ শৃঙ্খল এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। তাই একুশশতকের পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো,আমরা কি আমাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে জাতীয় স্বার্থে অর্থাৎ নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিতকরার শক্তিতে রূপান্তর করতে পারব? বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা, ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিককৌশলগত পুনর্বিন্যাস, বাণিজ্যিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক সংযোগের নতুনউদ্যোগগুলো এই প্রশ্নকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। গণঅভ্যুত্থান-উত্তর প্রথম গণতান্ত্রিকসরকারের প্রধানের চীন সফরের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদেরকে বাংলাদেশ-চীনসম্পর্কের দিকে নতুন করে তাকাতে হবে। কারণ আজকের বিশ্বে চীন কেবল রাজনৈতিক ও সামরিক দিকদিয়ে একটি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রই নয়; এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্র,অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক শক্তি এবং বৈশ্বিক অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রধান উৎসগুলোর একটি। চীনেরউদ্যোগে গড়ে ওঠা বন্দর, রেলপথ, সড়ক, জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামো ইতোমধ্যে এশিয়া, আফ্রিকা ওইউরোপের বহু দেশের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছে।ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নটি কোনো রাজনৈতিকআদর্শ বা আবেগনির্ভর বিষয় নয়; বরং এটি জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নিরঙ্কুশসার্বভৌমত্বের জন্য আঞ্চলিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে নিজস্ব অবস্থানকেশক্তিশালী করার প্রশ্ন। একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র কখনো একক নির্ভরতার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধরাখে না; বরং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নিজের কৌশলগত পরিসর প্রসারিত করে। বাংলাদেশেরক্ষেত্রেও চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে সেই বৃহত্তর বাস্তবতার আলোকে দেখতে হবে যেখানে অবকাঠামোউন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্পায়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ একে অপরেরপরিপূরক হয়ে জাতীয় সক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে পারে। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিবেশে এইসম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার প্রশ্নটি তাই কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; এটিবাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগতসিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘বাস্তববাদী’ (রিয়েলিস্ট) তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে রাষ্ট্রসমূহেরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু থাকে না; আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রে থাকে কেবল স্থায়ী জাতীয় স্বার্থ।আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ‘অরাজক’ (এনার্কিক) কাঠামোয় প্রতিটি রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো নিজেরনিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং কৌশলগত সক্ষমতা নিশ্চিত করা। ফলে রাষ্ট্রীয়সম্পর্ক আবেগ, আদর্শ কিংবা সাময়িক রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে নয়; বরং জাতীয়স্বার্থের নিরিখে নির্ধারিত হয়। ব্রিটিশ রাষ্ট্রনায়ক লর্ড পামারস্টনের (১৭৮৪–১৮৬৫) বহুল উদ্ধৃতবক্তব্যও একই সত্যকে প্রতিফলিত করে। অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়েতিনি বলেছেন, ‘আমাদের কোনো শাশ্বত মিত্র নেই এবং কোনো চিরস্থায়ী শত্রুও নেই। আমাদের স্বার্থইশাশ্বত ও চিরস্থায়ী এবং সেই স্বার্থ অনুসরণ করাই আমাদের কর্তব্য’। প্রায় দুই শতাব্দী আগেউচ্চারিত এই বক্তব্য আজও আন্তর্জাতিক কুটনীতি ও রাজনীতির অন্যতম মৌলিক নীতিবাক্য হিসেবেবিবেচিত হয়।সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশেরও উচিত চীনকে দেখা আবেগ বা ভীতি দিয়ে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থেরআলোকে। কোনো বৃহৎ শক্তির প্রতি অন্ধ সমর্থন যেমন একটি দায়িত্বশীল পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্যহতে পারে না, তেমনি অকারণ সন্দেহ বা রাজনৈতিক পূর্বধারণার বশবর্তী হয়েও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয়স্বার্থকে উপেক্ষা করা সমীচীন নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটিভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক কূটনীতি গড়ে তোলা, যা বিভিন্ন পরাশক্তির সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থেরভিত্তিতে সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করবে, কিন্তু দেশের স্বাধীন নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা ও নিরঙ্কুশসার্বভৌমত্বকে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন করবে না। অর্থাৎ সম্পর্কের গভীরতা নির্ধারিত হবে জাতীয়প্রয়োজনের ভিত্তিতে, কোনো পক্ষের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়। গত কয়েক বছরে বিশ্ব রাজনীতিরকেন্দ্র ধীরে ধীরে আটলান্টিক অঞ্চল থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সরে এসেছে। বৈশ্বিক উৎপাদন,সরবরাহ শৃঙ্খল, সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুওক্রমশ এই অঞ্চলে স্থানান্তরিত হচ্ছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরকেঘিরে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান,ইউরোপীয় শক্তিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র ও জোট এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সক্রিয়। এই নতুনবাস্তবতায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, একইসঙ্গে অনেক বেশি স্পর্শকাতর। কারণ এই ভূখণ্ড এখন কেবল একটি জাতীয় ভূখণ্ড নয়; বরং বৃহত্তরআঞ্চলিক সংযোগ, সামুদ্রিক বাণিজ্য, অর্থনৈতিক করিডর এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের একটিগুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে।বাংলাদেশ একদিকে দক্ষিণ এশিয়ার অংশ, অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার। বঙ্গোপসাগরেরতীরবর্তী অবস্থান, স্থলবেষ্টিত উত্তর-পূর্ব ভারতের নিকটবর্তিতা এবং মিয়ানমারের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগস্থল- সব মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংযোগকেন্দ্র। যদিএই ভৌগোলিক সুবিধাকে কার্যকর যোগাযোগ অবকাঠামো, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য, আধুনিকবন্দরব্যবস্থা, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলেবাংলাদেশ কেবল একটি ট্রানজিট রাষ্ট্র নয়, বরং একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রস্থল বামূলকেন্দ্রে (হাব) পরিণত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। এদেশের ভূগোল তখন আর কেবলমানচিত্রের একটি অবস্থান হয়ে থাকবে না; সেটি জাতীয় সম্পদে রূপান্তরিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে ‘সার্বিক কৌশলগতসহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব’ (কম্প্রিহেন্সিভ স্ট্র্যাটিজিক কোঅপারেটিভ পার্টনারশীপ)-এ উন্নীতকরার ঘোষণা দিয়েছিল এবং অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য ওমানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছিল। এই ঘোষণারতাৎপর্য ছিল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে প্রচলিত উন্নয়ন সহযোগিতার সীমা অতিক্রম করে দীর্ঘমেয়াদিকৌশলগত অংশীদারিত্বের কাঠামোয় নিয়ে যাওয়া। গণঅভ্যুত্থান-উত্তর রাজনৈতিক পালাবদলের পরসাম্প্রতিক বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর এবং চীনা প্রধানমন্ত্রীর মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ-চীনসংযোগ সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব (তথা ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’) সেইধারাবাহিকতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে স্থলপথে সরাসরি সংযোগ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা শুধু দুইদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগই সৃষ্টি করবে না; বরং বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া ওদক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি কার্যকর স্থলভিত্তিক অর্থনৈতিক সেতুতে পরিণত করার নতুনদিগন্তও উন্মোচন করতে পারে। তাই এই সফরকে কেবল একটি নিয়মিত কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখলেভুল হবে; বরং এটি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ, যা বিচক্ষণতাও দূরদর্শিতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানউল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হতে পারে।আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কেবল অবকাঠামোউন্নয়ন বা ঋণ গ্রহণ নয়; বরং স্থলপথে সংযোগসহ বহুমাত্রিক সংযোগ (মাল্টি-ডাইমেনশানালকনেক্টিভিটি) প্রতিষ্ঠা করা। কারণ একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব অর্থনীতিতে উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিশুধু পুঁজি নয়, বরং সংযোগ। কারণ সংযোগই হলো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মৌলিক সোপান। একটি দেশেরসড়ক, রেল, সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর, ডিজিটাল অবকাঠামো, জ্বালানি নেটওয়ার্ক এবং আন্তঃসীমান্তবাণিজ্যব্যবস্থা যত বেশি পরস্পর সংযুক্ত হবে, সেই দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রতিযোগিতামূলকশক্তি এবং কৌশলগত গুরুত্বও তত বৃদ্ধি পাবে। আধুনিক উন্নয়ন অর্থনীতিতে এ কারণেই ‘সংযোগসক্ষমতা’ (কনেক্টিভিটি)-কে কেবল যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং উৎপাদন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ,প্রযুক্তি, জ্ঞান ও মানুষের চলাচলকে একীভূত করার একটি সামগ্রিক উন্নয়ন কাঠামো হিসেবে দেখা হয়।ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যে অঞ্চল বাণিজ্যপথের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে, সেই অঞ্চলইদীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও লাভবান হয়। মধ্যযুগে সিল্ক রোড যেমন ইউরেশিয়ার অর্থনীতিকেচাঙ্গা ও রূপান্তরিত করেছিল, তেমনি আধুনিক যুগে সড়ক, রেল, সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক করিডর এবংবহুমাত্রিক সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নয়নের নতুন ভিত্তি তৈরি করছে। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণঅর্থনৈতিক উত্থানের পেছনে দেখা যায়, যে রাষ্ট্র বা অঞ্চল বাণিজ্য প্রবাহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণতহয়েছে, সেখানেই শিল্পায়ন, নগরায়ণ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সম্পদ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের গতিত্বরান্বিত হয়েছে। তাই বর্তমান বিশ্বে সংযোগ অবকাঠামোতে বিনিয়োগকে কেবল উন্নয়ন প্রকল্পহিসেবে নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ভূ-অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।সাম্প্রতিক সময়ে চীনের পক্ষ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশকে স্থলপথে যুক্ত করার প্রস্তাব নতুনকরে আলোচনায় এসেছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে চীনের ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশেরমধ্যে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে পারে, যা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ওমোংলা বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।অপরদিকে মিয়ানমারের সাথেও আমাদের সম্পর্ক উন্নয়নে এ উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষমহবে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক যোগাযোগের সঙ্গে স্থলভিত্তিক যোগাযোগের একটিকার্যকর সমন্বয় সৃষ্টি হবে, যা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী একটিস্বাভাবিক অর্থনৈতিক সেতুতে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করবে। বিশেষত ইউনানের মতো চীনেরঅভ্যন্তরীণ প্রদেশগুলোর জন্য সমুদ্রে পৌঁছানোর একটি বিকল্প ও তুলনামূলকভাবে স্বল্প দূরত্বের পথউন্মুক্ত হতে পারে, আর বাংলাদেশের জন্য সৃষ্টি হতে পারে নতুন ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট, লজিস্টিকসও শিল্প বিনিয়োগের সুযোগ। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সংযোগ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ারমধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। একইসঙ্গে এটি আঞ্চলিক মূল্য শৃঙ্খল ও উৎপাদন নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবেবৃদ্ধি করতে পারে। বর্তমানে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থা ক্রমেই আন্তঃসীমান্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপরনির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ফলে যে দেশ নিজেকে কার্যকর সংযোগকেন্দ্রে রূপান্তর করতে পারে, সে দেশকেবল পণ্য পরিবহনের পথই নয়, বরং উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বিতরণ এবংসেবাভিত্তিক অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়। বাংলাদেশের জন্যও এই সম্ভাবনা বাস্তবএবং অর্জনযোগ্য, যদি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নীতিগত সংস্কার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার পরিবেশনিশ্চিত করা যায়।অর্থনীতির ভাষায় সংযোগ মানে শুধু রাস্তা নয়; সংযোগ মানে বাজার। আরও বিস্তৃত অর্থে, সংযোগ মানেসুযোগের সম্প্রসারণ। বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বাজার যদি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের বৃহৎ বাজারের সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত হয়, তাহলে উৎপাদন, রপ্তানি, পর্যটন,লজিস্টিকস, গুদামজাতকরণ, ই-কমার্স এবং সেবাখাত নতুন গতি পেতে পারে। পরিবহন ব্যয় ও সময় কমেএলে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়বেএবং দেশের শিল্পাঞ্চলগুলো আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ারসুযোগ পাবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলো, যা দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগতপশ্চাৎপদতা, সীমিত শিল্পায়ন এবং দুর্বল আঞ্চলিক সংযোগের কারণে তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশঘটাতে পারেনি, তারা উন্নয়নের নতুন দিগন্তে প্রবেশ করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়নএবং সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করা গেলে এই অঞ্চলগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরঅন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা ধারণ করে। তবে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কউন্নয়নে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা বিশেষভাবে প্রয়োজন। চীনের সঙ্গে সম্পর্কউন্নয়ন মানে কোনো একক পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া নয়। বরং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেবহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। বর্তমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় একটি দায়িত্বশীলরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সাফল্য নির্ধারিত হয় সে কত দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কেরভারসাম্য রক্ষা করতে পারে তার ওপর। বাংলাদেশের মতো মধ্যম আকারের একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রেরজন্যও সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবংবহুমুখী কূটনৈতিক পরিসর। ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার অর্থ কখনোই অন্য কোনো রাষ্ট্রেরসঙ্গে সম্পর্ককে দুর্বল করা নয়; বরং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে সহযোগিতার পরিধিকে আরোসম্প্রসারণ করা।আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে বলা হয় ‘কৌশলগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ (স্ট্র্যাটিজিক হেজিং),অর্থাৎ কোনো একটি শক্তির শিবিরে না গিয়ে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের স্বার্থকেসর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া। এই কৌশলের মূল দর্শন হলো প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক পরিবেশে এমনএকটি ভারসাম্য সৃষ্টি করা, যাতে কোনো একটি পরাশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি না হয়এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সহযোগিতারসুযোগও উন্মুক্ত থাকে। সাম্প্রতিক দশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ, বিশেষ করে আসিয়ানভুক্তরাষ্ট্রগুলো, এই নীতির বিভিন্ন রূপ অনুসরণ করে বৃহৎ শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতাকেনিজেদের উন্নয়নের সুযোগে রূপান্তর করার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের জন্যও সেটিই সবচেয়ে কার্যকর ওদূরদর্শী পথ। কারণ একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি কেবল কূটনৈতিক স্বাধীনতাই নিশ্চিত করে না;বরং আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সময় রাষ্ট্রের কৌশলগত স্থিতিস্থাপকতাও বৃদ্ধি করে। চীনের সঙ্গেসম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহযোগিতাবৃদ্ধি করা। গত চার দশকে চীন যেভাবে অবকাঠামো, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, গবেষণা, উচ্চশিক্ষা, ডিজিটালউদ্ভাবন এবং দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার অভিজ্ঞতাবাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে শিক্ষণীয়। আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উচ্চগতিররেলব্যবস্থা, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, ই-কমার্স এবং ডিজিটাল শাসনব্যবস্থার মতো বহু ক্ষেত্রেচীনের অভিজ্ঞতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।বাংলাদেশের উচিত এই অভিজ্ঞতাকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং প্রযুক্তিস্থানান্তর, গবেষণা সহযোগিতা, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প অংশীদারিত্ব, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবংউদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা।তবে সেই অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে হবে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে এবং রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে উপযোগিতাবিচার করেই। কারণ কোনো দেশের উন্নয়ন মডেল হুবহু অন্য দেশে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়; প্রতিটিরাষ্ট্রের ইতিহাস, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সামাজিকবাস্তবতা ভিন্ন। ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞতার অন্ধ অনুকরণ নয়, বরংঅভিজ্ঞতাসঞ্জাত শিক্ষার বিচক্ষণ অভিযোজন। উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়;উন্নয়ন হলো দক্ষ প্রতিষ্ঠান, মানবসম্পদ, সুশাসন, জবাবদিহি, নীতির ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদিপরিকল্পনার সমন্বিত ফল। সড়ক, সেতু কিংবা বন্দর নির্মাণ তখনই টেকসই অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনে,যখন সেগুলোকে দক্ষ প্রশাসন, কার্যকর নীতি, উৎপাদনশীল শিল্প এবং প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায়মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলোকৌশলগত দূরদৃষ্টি। আমরা প্রায়ই অদূরদর্শী প্রকল্পভিত্তিক চিন্তা করি, কিন্তু যে কোনো রাষ্ট্রএগোয় তার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রজন্মভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে। রাষ্ট্র পরিচালনায়বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, বরং একটি সমন্বিত জাতীয় উন্নয়নের রূপকল্পই দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির ভিত্তিনির্মাণ করে। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা চীনের সাফল্যের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকব্যাপী সুসংহতরাষ্ট্রীয় কৌশল এবং সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিরপরিবর্তন কিংবা অভিযোজনের দৃঢ় সক্ষমতা। এসব দেশ সরকার পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে উঠে কিছু মৌলিকজাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারকে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করেছে বলেই আজকের অবস্থানে পৌঁছাতেসক্ষম হয়েছে।বাংলাদেশেরও প্রয়োজন তেমন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার ত্রিমাত্রিক (স্বল্প, মধ্য ওদীর্ঘ) বাস্তবায়নের টেকসই রূপকল্প, যেখানে চীনসহ বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ পরাশক্তির সঙ্গেসম্পর্ককে জাতীয় উন্নয়নের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হবে। সেই রূপকল্পে অবকাঠামো,শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, শিক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সংযোগ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবংমানবসম্পদ উন্নয়নকে একটি অভিন্ন জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। পররাষ্ট্রনীতি তখনআর কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনার বিষয় থাকবে না; বরং তা হয়ে উঠবে অর্থনৈতিক রূপান্তর,রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।আজকের বিশ্বে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আর চীনপন্থী নাপশ্চিমাপন্থী হওয়ার নয়। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশপন্থী হওয়ার এবং দেশের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিকসক্ষমতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির। পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য কোনো পরাশক্তির প্রতি আনুগত্যে নয়; বরংরাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে।পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় আদর্শিক বিভাজনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিকপ্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কৌশলগত সংযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলে কার্যকর অংশগ্রহণ। ফলে বাংলাদেশের জন্যও পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত জাতীয়উন্নয়ন, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা।যে সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং জাতীয় সক্ষমতাবৃদ্ধি করবে, সেই সম্পর্কই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে একুশ শতকের বাংলাদেশের জন্যপ্রয়োজনীয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্মার্ট অবকাঠামো, উন্নতযোগাযোগ প্রযুক্তি এবং জ্ঞানভিত্তিক শিল্পের এই যুগে কেবল প্রচলিত কূটনৈতিক সম্পর্ক দিয়েরাষ্ট্রের অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব, যা বিনিয়োগেরপাশাপাশি প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণা সহযোগিতা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতাবৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও এই বৃহত্তর উন্নয়ন-দৃষ্টিভঙ্গিরআলোকে মূল্যায়িত হওয়া উচিত। সুতরাং চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক উন্নয়ন কোনো বিলাসিতা নয়;বরং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় একটি কৌশলগত প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেবাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। বিশেষ করে যখনদক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিরকেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, তখন বাংলাদেশের জন্য নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক ওকৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করার বিকল্প নেই। মিয়ানমার হয়ে সম্ভাব্য স্থলপথে সংযোগ, আঞ্চলিকবাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্প বিনিয়োগ, বন্দরভিত্তিক অর্থনীতি এবং বহুমাত্রিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কেরবিকাশ- এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারলে বাংলাদেশ শুধু একটি ভোক্তা অর্থনীতি নয়, বরংএকটি আঞ্চলিক উৎপাদন, পরিবহন ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। একইসঙ্গে অঞ্চলের যেকোনো প্রতিবেশীর একক আধিপত্যবাদী প্রবণতার মুখে বাংলাদেশের কৌশলগতবিকল্প এবং স্বাধীন নীতিনির্ধারণী সক্ষমতাও আরও শক্তিশালী হবে।তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, চীনের সাথে বাংলাদেশের সেই সম্পর্ক হতে হবে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন,স্বার্থভিত্তিক, দূরদর্শী এবং কৌশলী। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা কখনোইআত্মসমর্পণের সমার্থক হতে পারে না; বরং পারস্পরিক সম্মান, সমতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাএবং অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতেই একটি টেকসই অংশীদারিত্ব গড়ে ওঠে। বাংলাদেশেরও উচিত এমন একটিআত্মবিশ্বাসী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যা একদিকে যেমন বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ পরাশক্তির সঙ্গেগঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখবে, অন্যদিকে তেমনি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন থাকবে। আবেগনয়, জাতীয় স্বার্থ; নির্ভরতা নয়, অংশীদারিত্ব; এবং তাৎক্ষণিক লাভ নয়, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয়কল্যাণ- এই তিন নীতিই হওয়া উচিত বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ভিত্তি। এই তিনটি নীতিকেসামনে রেখে যদি বাংলাদেশ আগামী দিনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পথচলা নির্ধারণ করতে পারে, তাহলেচীনের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা বাংলাদেশেরবহুমাত্রিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক নেতৃত্বের সম্ভাবনা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদাবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। আর সেটিই হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রকৃতসাফল্য যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রের সাথে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে একটি সমৃদ্ধ,আত্মমর্যাদাশীল, সার্বভৌম ও ভবিষ্যতমুখী বাংলাদেশ নির্মাণ।(পর্ব-১: চলবে) • লিখেছেন: ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।