ইসরাইলের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার চেয়েও বড় ও বহুমুখী আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান—এমন দাবি করা হয়েছে ইসরাইলি গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ইরান তার আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে একই সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই অভিযানে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতিস, গাজাভিত্তিক হামাস এবং ইরাক ও সিরিয়ায় সক্রিয় ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে লেবানন, গাজা, ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়া—একাধিক ফ্রন্ট থেকে একই সময়ে ইসরাইলকে চাপে ফেলার লক্ষ্য থাকতে পারে।ইসরাইলি গোয়েন্দাদের দাবি, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের কর্মকর্তারা হিজবুল্লাহ, হুতিস এবং ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া কমান্ডারের সঙ্গে বৈঠক ও সম্মেলন করেছেন। এসব আলোচনায় সম্ভাব্য হামলার পরিধি বাড়ানো, পারস্পরিক সমন্বয় জোরদার এবং যৌথ প্রশিক্ষণের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে অপারেশনাল যোগাযোগও বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।৭ অক্টোবরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরাইলে আকস্মিক বড় ধরনের হামলা চালানোর সময় ইরান ও হিজবুল্লাহ ওই অভিযানের নির্দিষ্ট সময় ও বিস্তারিত পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে থেকে অবহিত ছিল না—এমন মার্কিন ও ইসরাইলি মূল্যায়নের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।হামাসের ওই হামলার পর হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলে হামলা চালালেও প্রত্যাশিত মাত্রায় সমন্বিত আঞ্চলিক সংঘাত দেখা যায়নি। ইসরাইলি গোয়েন্দাদের ধারণা, এবার সেই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলো।গাজা থেকে উদ্ধার করা কিছু নথির ভিত্তিতে মার্কিন ও ইসরাইলি মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, হামাসের তৎকালীন নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের প্রত্যাশা করেছিলেন। হামাসের প্রাথমিক সাফল্যের পর ইরান ও হিজবুল্লাহ সরাসরি বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে—এমন ধারণা ছিল তার। তবে বাস্তবে তা হয়নি।বর্তমান কথিত পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য ওই পরিস্থিতি পরিবর্তন করা হতে পারে বলে মনে করছে ইসরাইলি গোয়েন্দারা।উত্তর ও দক্ষিণে একসঙ্গে চাপের আশঙ্কাইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীও ইরানের সহায়তায় হামাস ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে সমন্বয় বাড়ার কথা জানিয়েছে। এর ফলে ইসরাইলকে একই সময়ে উত্তর ও দক্ষিণ—দুই দিক থেকে চাপের মুখে পড়তে হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।তবে প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যের বড় অংশই ইসরাইলি গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল। ইরান এ ধরনের বড় সমন্বিত হামলার পরিকল্পনা করছে—এমন স্বাধীন ও প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি। হামলার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা সময়সূচিও প্রকাশ্যে জানা যায়নি।বাড়ছে আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকিযুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বাড়ার মধ্যেই এই গোয়েন্দা সতর্কবার্তা সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি তেলবাহী তিনটি জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং এর জবাবে ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে ইরান।ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরান-সমর্থিত একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী একই সময়ে বড় ধরনের হামলা শুরু করলে এর প্রভাব ইসরাইল-ইরান সংঘাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পারে। লেবানন, গাজা, ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়ায় একযোগে সংঘাত তীব্র হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিও সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে কথিত হামলার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় এটিকে আসন্ন হামলার নিশ্চিত ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার একটি সম্ভাব্য হুমকি মূল্যায়ন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।সূত্র: এনডিটিভি ও জেরুজালেম পোস্ট