ভালো ঘুম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কী খাওয়া হচ্ছে, কখন খাওয়া হচ্ছে এবং খাবারের পরিমাণ—এসব যেমন ঘুমের মানকে প্রভাবিত করে, তেমনি পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবও ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি মানুষের পছন্দ বদলে দিতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাও জরুরি।ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, বাদাম, ডাল, মাছ ও স্বাস্থ্যকর চর্বিসমৃদ্ধ ভূমধ্যসাগরীয় ধাঁচের খাবার ঘুমের জন্য উপকারী হতে পারে। এসব খাবার শরীরের হরমোনের ভারসাম্য এবং অন্ত্র ও মস্তিষ্কের পারস্পরিক যোগাযোগ বা ‘গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস’কে সহায়তা করে। গবেষণায় ফল ও সবজি বেশি খাওয়ার সঙ্গে ভালো ঘুম এবং অনিদ্রার উপসর্গ কমার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।যেসব খাবার উপকারীটমেটো, কলা, বাদাম, পূর্ণ শস্য ও টক চেরিতে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ঘুম-সম্পর্কিত হরমোন ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার থেকে পাওয়া ট্রিপটোফ্যান শরীরে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তবে কোনো একটি খাবারকে ঘুমের ‘ওষুধ’ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই; সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট নিয়মিত খেলে ঘুমের মান খারাপ হতে পারে। বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও অতিরিক্ত চিনি কম গভীর ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণে রাতে অতিরিক্ত ভারী, চর্বিযুক্ত ও মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।ক্যাফেইন ও রাতের খাবারে সতর্কতাকফি, চা ও এনার্জি ড্রিংকের মতো ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় বিকেলের পর কমিয়ে আনা বা এড়িয়ে চলা অনেকের ঘুমের জন্য উপকারী। কারণ ক্যাফেইনের প্রভাব শরীরে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে। অ্যালকোহল শুরুতে ঘুম ঘুম ভাব তৈরি করলেও পরে ঘুমের স্বাভাবিক ধাপ, বিশেষ করে গভীর ঘুম ব্যাহত করতে পারে।ঘুমানোর ঠিক আগে বড় খাবার খেলে হজমের সমস্যা, অস্বস্তি এবং রাতে বারবার জেগে ওঠার প্রবণতা বাড়তে পারে। আবার অতিরিক্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতেও সমস্যা হতে পারে। তাই ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে পরিমিত রাতের খাবার শেষ করা ভালো। রাতের শিফটে কর্মরতদের ক্ষেত্রে খাবার ও ঘুমের সময়ের সমন্বয় আরও গুরুত্বপূর্ণ।ঘুমের ঘাটতিতেও বাড়ে অস্বাস্থ্যকর খাবারের ঝুঁকিখাবার যেমন ঘুমকে প্রভাবিত করে, ঘুমের ঘাটতিও খাবারের অভ্যাস বদলে দিতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনে পরিবর্তন ঘটতে পারে। এতে ক্ষুধা বাড়ার পাশাপাশি চর্বি ও চিনিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণও বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা ও ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে।ফলে কম ঘুম থেকে অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আকর্ষণ এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার থেকে আরও খারাপ ঘুম—এমন একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হতে পারে।ঘুম ভালো রাখতে আরও যা জরুরিশুধু খাবারের পরিবর্তন করলেই ভালো ঘুম নিশ্চিত হয় না। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও জাগা, দিনের আলোতে পর্যাপ্ত সময় কাটানো, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং ঘুমের আগে অতিরিক্ত আলো ও উত্তেজক কার্যক্রম কমানো জরুরি। পাশাপাশি ঘুমের পরিবেশ শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখা উচিত।পুষ্টির ঘাটতিও ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ঘুমের সমস্যা হলেই নিজের মতো করে ম্যাগনেসিয়াম, মেলাটোনিন বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা ঠিক নয়। দীর্ঘদিন অনিদ্রা, অতিরিক্ত নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা কিংবা দিনের বেলায় অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।শেষ কথাভালো ঘুমের জন্য কোনো ‘ম্যাজিক ফুড’ নেই। বরং ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনসমৃদ্ধ বৈচিত্র্যময় খাবার, পরিমিত খাদ্য গ্রহণ, সঠিক সময়ে রাতের খাবার এবং নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস—সব মিলিয়েই সুস্থ জীবনযাপনের ভিত্তি তৈরি হয়। খাবার ও ঘুমকে আলাদা বিষয় হিসেবে না দেখে একই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে দেখাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি উপকারী।সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ও ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক।