স্মার্টফোননির্ভর জীবনে মুসলিমদের দৈনন্দিন ইসলামচর্চা সহজ করতে বিভিন্ন ‘ইসলামিক লাইফস্টাইল অ্যাপ’ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নামাজের সময়সূচি, কিবলার দিকনির্ণয়, কোরআন তেলাওয়াত ও বিভিন্ন ধর্মীয় তথ্যের সুবিধা থাকলেও এসব অ্যাপ ব্যবহারকারীর দীর্ঘমেয়াদি আত্মিক বিকাশে কতটা ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব হিউম্যান-কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশন (IJHCI)-এ প্রকাশিত ‘ইসলামিক লাইফস্টাইল অ্যাপ্লিকেশনস: মিটিং দ্য স্পিরিচুয়াল নিডস অব মডার্ন মুসলিমস’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, জনপ্রিয় অধিকাংশ ইসলামিক অ্যাপ প্রাথমিক প্রযুক্তিগত সুবিধা দিতে পারলেও ব্যবহারকারীর অন্তর্নিহিত প্রেরণা, ধর্মীয় আত্মশাসন, দক্ষতা ও সামাজিক সংযোগ বৃদ্ধিতে সেগুলোর ভূমিকা সীমিত।ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (IUT), যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি, কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন এবং কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটির গবেষক মহসিনুল কবির, মোহাম্মদ রিজওয়ান কবির ও রিয়াসাত ইসলাম গবেষণাটি পরিচালনা করেন। এতে বহুল ব্যবহৃত ১১টি ইসলামিক লাইফস্টাইল অ্যাপের কারিগরি ও মনস্তাত্ত্বিক দিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি তরুণ মুসলিম ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশাও পর্যালোচনা করা হয়।গবেষণায় ‘সেলফ-ডিটারমিনেশন থিওরি’ (SDT) এবং ‘টেকনোলজি-অ্যাজ-এক্সপেরিয়েন্স’ (TAE) কাঠামো ব্যবহার করে অ্যাপগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়। এতে দেখা যায়, এসব অ্যাপ দৈনন্দিন ধর্মীয় অনুশীলনে স্বল্পমেয়াদি উৎসাহ দিতে পারলেও আত্মিক উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় ধারাবাহিক নির্দেশনা ও শিক্ষামূলক সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।আত্মনির্ভর ধর্মচর্চায় ঘাটতিগবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অধিকাংশ অ্যাপে নামাজের সময় মনে করিয়ে দেওয়া বা অ্যালার্মের ব্যবস্থা থাকলেও নামাজের সঠিক নিয়ম, এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা এবং ধারাবাহিক আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত নির্দেশনা নেই। ফলে ব্যবহারকারী প্রযুক্তিনির্ভর স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন।অ্যাপগুলোর ‘প্রোগ্রেস ট্র্যাকার’ বা লক্ষ্য নির্ধারণের সুবিধাও অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কার্যকর নয়। ব্যবহারকারীর ধর্মীয় অনুশীলনের অগ্রগতি নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক প্রতিক্রিয়ার ঘাটতি থাকায় দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর আগ্রহ কমে যেতে পারে।সামাজিক সংযোগও সীমিতগবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন অ্যাপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য শেয়ারের সুবিধা থাকলেও বিশ্বস্ত ধর্মীয় গ্রুপ, শিক্ষিত আলেম বা ধর্মীয় পরামর্শদাতার সঙ্গে নিরাপদভাবে যোগাযোগের সুযোগ সীমিত। ফলে অ্যাপগুলো ধর্মীয় অনুশীলনে সামাজিক ও মানবিক সহায়তার বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না।তরুণ ব্যবহারকারীদের সাক্ষাৎকারেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। তারা জানিয়েছেন, মোবাইলের নোটিফিকেশন নিয়মিত নামাজ আদায়ে কিছুটা সহায়তা করে। তবে একই ধরনের যান্ত্রিক নোটিফিকেশন দীর্ঘদিন চলতে থাকলে এর কার্যকারিতা কমে যায়। পাশাপাশি মসজিদ, জামাত ও প্রকৃত আলেমদের সাহচর্যের বিকল্প হিসেবে কেবল অ্যাপকে তারা দেখছেন না।বিজ্ঞাপন ও গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগগবেষণায় ইসলামিক অ্যাপগুলোর বিজ্ঞাপনব্যবস্থা ও তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। বিনামূল্যের সংস্করণে প্রদর্শিত কিছু বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ইবাদতের পরিবেশ ও মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিশেষ করে কোরআন পাঠ বা ধর্মীয় অনুশীলনের সময় অনুপযুক্ত বিজ্ঞাপন ব্যবহারকারীদের বিরক্তির কারণ হতে পারে।এ ছাড়া ‘মুসলিম প্র’-এর মতো জনপ্রিয় অ্যাপসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারকারীর তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্বেগের কারণে কেউ কেউ অ্যাপের ব্যবহার সীমিত করছেন বা তা সরিয়ে ফেলছেন।অ্যাপকে আধ্যাত্মিক সহচর করার সুপারিশগবেষকরা মনে করেন, প্রযুক্তি ও ইসলামী শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এসব অ্যাপ আধুনিক মুসলিমদের জন্য কার্যকর ‘আধ্যাত্মিক সহচর’ হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য কয়েকটি সুপারিশও দেওয়া হয়েছে।প্রথমত, কোরআনের ব্যাখ্যা, হাদিস শিক্ষা এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য দোয়া নিয়ে কাঠামোবদ্ধ শিক্ষামূলক মডিউল যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।দ্বিতীয়ত, ইবাদতের পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে প্রচলিত বিজ্ঞাপননির্ভর আয়ের পরিবর্তে ওয়াকফ বা দানভিত্তিক অর্থায়নের মডেল বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।তৃতীয়ত, অ্যাপের ধর্মীয় বিষয়বস্তু ও ফিচার তৈরিতে প্রযুক্তিবিদদের পাশাপাশি বিজ্ঞ ইসলামী আলেমদের সম্পৃক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে উপস্থাপিত তথ্য সহিহ ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।সবশেষে, ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা নিশ্চিত করে ছোট পরিসরে ভার্চুয়াল তালিম ও ধর্মীয় চর্চার নিরাপদ পরিসর তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা।গবেষণার সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ হলো—ইসলামিক অ্যাপ নামাজের সময় মনে করিয়ে দেওয়া বা কোরআন পড়ার মতো তাৎক্ষণিক সুবিধা দিতে পারে; কিন্তু আত্মিক উন্নয়ন, ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন ও দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিকে মানবিক ও সামাজিক ধর্মীয় শিক্ষার পরিপূরক হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।