বাস্তবতা- নিকোলাস বিশ্বাসবাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তমঅধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই নিয়োগের মাধ্যমে প্রায় চার দশক পর বাংলাদেশআন্তর্জাতিক এই সম্মানজনক পদে প্রত্যাবর্তন করল। গত ২ জুনের নির্বাচনে ৯৯টি ভোট পেয়েসাইপ্রাসের প্রার্থী অ্যান্ড্রেয়াস এস. কাকুরিসকে পরাজিত করে ড. রহমান সভাপতির পদটি নিশ্চিতকরেন। জেনেভা ও নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এইঅভিজ্ঞ কূটনীতিক সম্পূর্ণ অধিবেশনজুড়ে সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।এছাড়া, আগামী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া উচ্চপর্যায়ের সাধারণ সভাও ড. রহমান সভাপতিত্বকরবেন, যা জাতিসংঘের বার্ষিক সূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেকরহমানসহ বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, প্রতি বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদেএকজন সভাপতি নির্বাচিত হন।প্রতিবার নতুন সভাপতি একটি ঘোষিত কর্মসূচি নিয়ে আসেন। এই কর্মসূচিকে আলাদা করে তোলা মূলবিষয়বস্তু নয়; কারণ - শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু কার্যক্রম, মানবাধিকার ও মানবিকসুরক্ষা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং বহুপাক্ষিকতার সংস্কার; এগুলো জাতিসংঘের পরিচিত শব্দভাণ্ডার। এইঅধিবেশনের প্রকৃত প্রশ্ন এই নয় যে, ড. রহমান কী-কী অগ্রাধিকার দিতে চান, বরং প্রশ্নটি হলো -সাধারণ পরিষদ একটি বিশ্ব মঞ্চ বা বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আদৌ কোনক্ষমতা রাখে কিনা? জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতির ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলো আগামী বারোমাসে কাঠামোগতভাবে অর্জনযোগ্য হবে কিনা তা নির্ভর করবে বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনীতি, বৈশ্বিকচাহিদা ও আচরণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রবলয়ের ভূমিকা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ধরণ ওআন্তরিকতার উপর।মূল সংকট: উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম অভূতপূর্ব বিশ্ব অস্থিরতাবিশ্ব আজ তার যৌথ ইতিহাসের আরেকটি সংকটময় অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। সশস্ত্র সংঘাত, ভূ-রাজনৈতিকপ্রতিদ্বন্দ্বিতা, মানবিক সংকট, জলবায়ু জরুরি অবস্থা, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিকপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা হ্রাস এমন সব চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে যা কোনো দেশেরপক্ষেই একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এমন একটি নির্ধারণী মুহূর্তে, জাতিসংঘ আজও এমন একটিঅন্যতম বিশ্বমঞ্চ যেখানে দেশগুলো একত্র হয়ে আলোচনা করতে এবং যৌথ সমাধান খুঁজতে পারে।জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে। প্রধানআলোচনাকারী, নীতিনির্ধারক ও প্রতিনিধিত্বকারী অঙ্গ হিসেবে সাধারণ পরিষদ ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রকেএক ছাদের নিচে নিয়ে আসে, যেখানে প্রতিটি দেশের একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। এটিজাতিসংঘের একমাত্র অঙ্গ যেখানে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র সমান মর্যাদায় অংশগ্রহণ করে। এর দায়িত্বেরপরিধি শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, মানবিক বিষয়াবলি, নতুন সদস্য গ্রহণ এবং জাতিসংঘেরবাজেট পর্যন্ত বিস্তৃত।এই পটভূমিতে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান ছয়টি মূল অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছেন:১) শান্তি ও নিরাপত্তা; ২) টেকসই উন্নয়ন; ৩) জলবায়ু পদক্ষেপ; ৪) মানবাধিকার ও মানবিক বিষয়াবলি;৫) প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI); ৬) বহুপাক্ষিকতার প্রতি আস্থা পুনর্গঠনযদিও এই অগ্রাধিকারগুলো আমাদের সময়ের জরুরি প্রয়োজনীয়তাগুলোকে প্রতিফলিত করে, তবে মূল প্রশ্নথেকেই যায়: সাধারণ পরিষদ কি এসব অঙ্গীকারকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করতে পারবে, নাকি বৈশ্বিকঅস্থিরতা এই বাস্তবায়নকে থমকে দেবে? বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে প্রতিটি অগ্রাধিকারবিশ্লেষণ করলে বাস্তবায়নের একটি পরিষ্কার পথরেখা পাওয়া যায়। ছয়টি অগ্রাধিকারের বিশ্লেষণ:অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়নে রূপান্তর:১. শান্তি ও নিরাপত্তা: সংকটের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের ওপর জোরশান্তি ও নিরাপত্তা জাতিসংঘের মূল লক্ষ্যের কেন্দ্রে অবস্থান করছে, অথচ নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক ভেটো ক্ষমতার ব্যবহারে প্রায়শই আন্তর্জাতিক ঐক্যমত অচল হয়ে পড়ে। এই অগ্রাধিকারকেবাস্তবে রূপ দিতে সংঘাত ঘটার পর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে আগাম সংঘাত প্রতিরোধ, দ্রুত মধ্যস্থতাএবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। সাধারণ পরিষদের সম-অধিকারেরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে - যেখানে কোনো একক দেশের ভেটো ক্ষমতা নেই - জাতিসংঘ রাজনৈতিক সংলাপ,বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং সংকট বড় আকারের মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেওয়ার আগেই শান্তিপ্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে।২. টেকসই উন্নয়ন: বাস্তবায়নের ঘাটতি পূরণঅর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনেরঅগ্রগতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অগ্রাধিকারকে দৃশ্যমান অগ্রগতিতে পরিণত করতে হলেজাতিসংঘকে আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে সম্পদ প্রদানেজোর দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; এটি বৈষম্য হ্রাস,বৈশ্বিক বাজারে সবার সমান প্রবেশাধিকার এবং কেবল অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে নয়, বরং মানুষের মর্যাদা ওস্থিতিস্থাপকতার ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন পরিমাপের দাবি রাখে।৩. জলবায়ু পদক্ষেপ: দায়বদ্ধতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণজলবায়ু পরিবর্তন এখন আর দূর ভবিষ্যতের কোনো হুমকি নয়; চরম আবহাওয়া প্রতিনিয়ত বহু বছরেরউন্নয়ন অগ্রগতি ধ্বংস করে দিচ্ছে। জলবায়ু লক্ষ্যকে পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হলে কেবল নামমাত্রঅঙ্গীকার থেকে বেরিয়ে এসে বাধ্যতামূলক জবাবদিহিতা, 39;ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি' (Loss and Damage)তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ সুরক্ষাকে যুক্ত করতে হবে।ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু পদক্ষেপ একটি টিকে থাকার লড়াই। আন্তর্জাতিকজলবায়ু ন্যায়বিচার ও সম্পদ হস্তান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সাধারণ পরিষদকে কাজ করতে হবে।৪. মানবাধিকার ও মানবিক সাড়াদান: মানুষকে প্রাধান্য প্রদানবৈশ্বিক সংঘাত প্রতিনিয়ত লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে, যা শরণার্থী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকেমৌলিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে। মানবাধিকার নীতিগুলোকে বাস্তব সুরক্ষায়রূপান্তর করতে মানবিক সহায়তাকে ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে মুক্ত করতে হবে। জাতিসংঘকে নিশ্চিতকরতে হবে যেন আন্তর্জাতিক আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয় - কোনো দ্বিমুখী নীতি ছাড়াই- যাতে সংঘাত যেখানেই ঘটুক না কেন মানবিক সহায়তা ও তহবিল সুরক্ষিত থাকে।৫. প্রযুক্তি ও এআই শাসন: ডিজিটাল বৈষম্য প্রতিরোধকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রাখে,তবে কয়েকটা ধনী দেশের হাতে প্রযুক্তি সীমাবদ্ধ থাকলে তা বৈশ্বিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এইঅগ্রাধিকারকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হলে নতুন প্রযুক্তির জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক শাসনকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। এআই নীতি নির্ধারণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমানঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রযুক্তিকে বৈশ্বিক বিভাজনের কারণ না বানিয়ে যৌথ অগ্রগতিরহাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।৬. বহুপাক্ষিকতার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন: সাফল্যের মূল নিয়ামকপূর্ববর্তী পাঁচটি অগ্রাধিকারের সফলতা সম্পূর্ণভাবে জাতিসংঘের নিজস্ব সংস্কার এবং ভাবমূর্তির ওপরনির্ভর করছে। যখন সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে অকার্যকর বা পক্ষপাতদুষ্ট বলেমনে করে, তখন বহুপাক্ষিকতা ব্যর্থ হয়। এই অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারেরমাধ্যমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উন্নয়নশীলদেশগুলোকে জোরালো কণ্ঠস্বর প্রদান করা প্রয়োজন। আস্থা পুনর্গঠন কেবল কোনো প্রশাসনিক বিষয়নয়; এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মূল শর্ত।বাস্তবায়নের ব্যবধান কমানোর উপায়৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের এই ছয়টি অগ্রাধিকার বর্তমান বিশ্ব সংকট মোকাবিলার জন্য একটিসুসংগঠিত কাঠামো প্রদান করে। নিরাপত্তা উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে, উন্নয়ন জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ায়,জলবায়ু স্থায়িত্ব মানবিক সংকট কমায় এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি এই সবগুলোকে গতিশীল করে।তবে কেবল ঘোষণাপত্র প্রকাশ বিশ্ব অস্থিরতা সমাধান করতে পারবে না। ৮১তম অধিবেশন তখনই এইছয়টি অগ্রাধিকারকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে পারবে, যখন সদস্য রাষ্ট্রগুলো সাধারণপরিষদের গণতান্ত্রিক মঞ্চকে - যেখানে প্রতিটি দেশের সমান ভোট রয়েছে - রাজনৈতিক ঐক্যমত তৈরি,আর্থিক সম্পদ সংস্থান এবং যৌথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহার করবে।বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল, তবে রাজনৈতিক মানসিকতা এবং বহুপাক্ষিক উদ্যোগের মাধ্যমে জাতিসংঘএই ছয়টি অগ্রাধিকারকে একটি স্থিতিশীল বিশ্বের জন্য বাস্তব সমাধানে রূপান্তর করতে পারে যদিওবিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের অতীত সাফল্য খুবই নগন্য।