চট্টগ্রামে ৬৩ বিদেশি নাগরিক আটকের ঘটনায় কথিত প্রতারক চক্রের মূল হোতার সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। তার নাম ও বাংলাদেশি মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (সিটিটিসি)। তবে অভিযানের খবর প্রকাশের পর ওই ব্যক্তি মোবাইল ফোন বন্ধ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।এ ঘটনায় ৬৩ বিদেশি নাগরিকের জন্য বাসা ভাড়া করে দেওয়ার অভিযোগে মোহাম্মদ মহসীন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, মহসীনের মাধ্যমে কথিত মূল হোতার সঙ্গে বিদেশিদের যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে।বাংলাদেশেই থাকার ধারণাসিটিটিসির উপ-পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) শামীম হোসেন রোববার বিকেলে বলেন, ৬৩ বিদেশিকে আটকের তিন দিন পর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের জন্য বাসা ভাড়া করে দেওয়া ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি চক্রটির প্রধান হোতা বলে ধারণা করা ব্যক্তির নাম ও বাংলাদেশি মোবাইল নম্বরও পাওয়া গেছে।তিনি বলেন, অভিযানের খবর প্রকাশের পর ওই ব্যক্তি ফোন বন্ধ করে দিয়েছেন এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন। তবে তার অবস্থান সম্পর্কে পুলিশ তথ্য পেয়েছে। তিনি বাংলাদেশেই আছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।পাসপোর্ট নিয়ে নতুন প্রশ্নবিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশ, অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে তাদের পাসপোর্ট নিয়েও নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সিটিটিসি জানিয়েছে, কয়েকজনের পাসপোর্ট পাওয়া গেলেও অধিকাংশের পাসপোর্ট এখনো পুলিশের হাতে আসেনি।পাসপোর্টগুলো কোথায়, কার কাছে ছিল এবং কেন বিদেশি নাগরিকদের কাছে পাওয়া যায়নি—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।বিদেশিদের বাংলাদেশে প্রবেশ ও অবস্থানের বিস্তারিত তথ্য জানতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) তদন্তে যুক্ত হয়েছে। তারা কোন দেশ থেকে, কী ধরনের ভিসায় এবং কখন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, এর আগে দেশের কোথায় অবস্থান করেছেন—এসব তথ্য যাচাই করছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো সিটিটিসির হাতে আসেনি।১৯১ ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষাগত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের খুলশীর কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে আটক করে সিটিটিসি ও খুলশী থানা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপসহ মোট ১৯১টি ডিজিটাল ডিভাইস ও বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।পুলিশের ধারণা, এসব ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষায় কথিত প্রতারক চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে আরও নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে। কোন ওয়েবসাইট ব্যবহার করা হতো, কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, কী ধরনের অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা হয়েছে এবং অর্থ লেনদেনের কোনো তথ্য রয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।ফরেনসিক পরীক্ষা শেষ হলে আটক বিদেশিরা কী ধরনের প্রতারণা বা সাইবার অপরাধে জড়িত ছিলেন, সে সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। একই সঙ্গে তাদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি কারা যোগাযোগ রাখতেন, সেই তথ্যও বেরিয়ে আসতে পারে।মহসীনের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে পুলিশমহসীনকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ৬৩ বিদেশি নাগরিক যে বাসায় অবস্থান করছিলেন, সেটি তাদের জন্য মহসীন ভাড়া করে দিয়েছিলেন।তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, মহসীনের ভূমিকা শুধু বাসা ভাড়া করে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি বিদেশিদের বাংলাদেশে অবস্থান ও কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তিনি আরও কোনো ধরনের সহযোগিতা করেছেন।পুলিশের আগে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব বিদেশি প্রায় দেড় মাস আগে ওই বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন। এর আগে তারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় অবস্থান করেছিলেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণাসহ বিভিন্ন সাইবার অপরাধে তারা যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।তদন্তকারীরা তাদের আগের অবস্থানগুলোর তথ্যও সংগ্রহ করছেন। একই সঙ্গে বিদেশিদের বাংলাদেশে আনা, থাকার ব্যবস্থা, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সরবরাহ এবং আর্থিক লেনদেনে স্থানীয় কারও ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।৬৩ বিদেশিকে আটকের পর তদন্তের মূল কেন্দ্রে রয়েছে তাদের ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল ডিভাইস, বাংলাদেশে প্রবেশ ও অবস্থানের তথ্য এবং স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকা। কথিত মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে পুরো নেটওয়ার্কের কর্মকাণ্ড ও সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছে পুলিশ।