দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকার সড়ক ও সেতু বেহাল হয়ে পড়েছে। খানাখন্দে ভরা সড়ক এবং ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কোথাও সংস্কারের পরপরই সড়ক ভেঙে পড়েছে, কোথাও আবার বছরের পর বছর ধরে ভাঙা সেতু দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন। এতে সড়ক ও সেতুগুলো এখন অনেকটা মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।দুই মাসেই বেহাল নোয়াখালীর সড়ক লক্ষ্মীপুর-দত্তপাড়া-চাটখিল-খিলপাড়া সড়কের মেরামতকাজ শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে খানাখন্দ ও গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও ফাটল ধরেছে, কোথাও সড়ক ধসে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। এতে যাত্রী ও যানবাহনের চালকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও দায়সারা কাজের কারণে সড়কের এ অবস্থা হয়েছে। এ কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের অভিযোগও উঠেছে।জানা গেছে, আওয়ামী লীগ শাসনামলের শেষ এক দশকে সড়কটিতে কোনো উন্নয়নকাজ হয়নি। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের প্রচেষ্টায় সড়কটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও কাজ শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই সড়কের বেহাল দশায় তারা ক্ষুব্ধ ও হতাশ।স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যাদেশ ও নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজ না করায় বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। কাজ শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পাথরের ওপরের কালো বিটুমিনের আবরণ উঠে গিয়ে অনেক অংশ ধূসর হয়ে গেছে। নির্মাণকাজে নিম্নমানের বিটুমিন এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম বিটুমিন ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। নিম্নমানের বিটুমিনযুক্ত পাথর ব্যবহারের কারণে হাতের টানেই সেগুলো উঠে আসছে।ইতোমধ্যে ১২ থেকে ১৩টি স্থানে সড়কের অংশ ধসে পড়েছে। এসব স্থানে বালুর বস্তা ও কালো পলিথিন দিয়ে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখা হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হলে সড়কটি খাল ও জমির দিকে আরও ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।সিএনজি চালক আব্দুল হান্নান বলেন, ‘এই ভাঙা রাস্তা নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন কষ্ট করেছি। আশা ছিল নতুন রাস্তা হলে সেই কষ্ট লাঘব হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, কাজ শেষ হওয়ার আগেই রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ করা হয়েছে।’ঠিকাদার মোরশেদ আলম বলেন, ‘এ সড়কটি এলজিইডি থেকে এসেছে। আমার গাইড ওয়াল ধরা আছে ১০৭ মিটার, সেখানে ১৮৬ মিটার করেছি। এখানে প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তা খুঁড়ে পাবলিক হেলথ নিয়মবহির্ভূতভাবে পানির পাইপলাইন দিয়েছে এবং রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটি পুকুর রয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা ডেবে গেছে। এই কাজে আমার ইস্টিমেটের বাইরে ৬০ লাখ টাকা লস হবে।’নোয়াখালী সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী সফিকুল ইসলাম জানান, চাটখিল-খিলপাড়া সড়কের প্রায় সাত কিলোমিটার অংশ মেরামতের জন্য ৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজটি পেয়েছে মেসার্স সেলিম অ্যান্ড ব্রাদার্স অ্যান্ড নুরুজ্জামান ইঞ্জিনিয়ারিং ফাউন্ডেশন জেবি। তবে কাজটি করেন নোয়াখালীর ঠিকাদার মোরশেদ আলম।অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কাজে নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের মতো কিছু অনিয়ম হয়েছে। বৃষ্টির পর সেগুলো রিফারিং করে দেওয়া হচ্ছে। ভারী বৃষ্টির কারণে কাজের সমস্যা হয়েছে। বৃষ্টি কমে যাওয়ায় এখন পুনরায় মেরামত করা হচ্ছে।মোহনগঞ্জে সড়ক-সেতুতে চরম ঝুঁকি মোহনগঞ্জ থেকে খুরশিমূল বাজার পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার সড়ক ও নয়াপাড়ার সেতু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভাটি অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।সড়কের প্রায় ৮০ শতাংশ পিচ উঠে গেছে। সড়কটি সরু হওয়ায় দুটি রিকশাও পাশাপাশি চলাচল করতে পারে না। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছেন পথচারী ও যাত্রীরা। ইতোমধ্যে বেশ কিছু দুর্ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও কোথাও চালকরা যাত্রী নামিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন পার করছেন।অফিসগামী মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও রোগীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। শিবির বাজারের পর নয়াপাড়া গ্রামের মেইন রোডের সেতুটির দুটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা। সেতুটির প্রায় ৯০ শতাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। বহুদিন আগে সাময়িকভাবে স্টিলের পাটাতন বসানো হলেও সেই অস্থায়ী ব্যবস্থার ওপর দিয়েই অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, রিকশা এমনকি মালবাহী লরিও চলাচল করছে।স্থানীয়রা জানান, সরু সড়ক ও ভাঙা সেতুর কারণে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। বিকল্প পথ না থাকায় বাধ্য হয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ সেতু ব্যবহার করতে হচ্ছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।ছোট পাইকুড়া, খুচীরগাঁও, করনশ্রী, উলোকান্দা, দাসপাড়া, জগদিশপুর, মানারকান্দী, খুরশিমূল, শিয়াধার, রামপাশা, বলদর্শী, পেরির চর, গৌরাকান্দা, মল্লিকপুর, নয়াপাড়া ও পাড়ারতিয়ারকোনাসহ প্রায় ১৬টি গ্রামের মানুষের মোহনগঞ্জ পৌর শহরে যাতায়াতের একমাত্র সড়ক এটি।মোহনগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকরামুল হক জানান, মোহনগঞ্জ থেকে খুরশিমূল যাওয়ার পথে খুচীরগাঁও এলাকার কালভার্টের অনুমোদন পাওয়া গেছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করে ঠিকাদার নিয়োগের পর কাজ শুরু হবে।গুরুদাসপুরে হাসপাতাল সড়কই মরণফাঁদ সংস্কারের অভাবে গুরুদাসপুরের অধিকাংশ সড়ক খানাখন্দে ভরে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সড়কের কার্পেটিং উঠে তৈরি হয়েছে অসংখ্য গর্ত। সবচেয়ে বেহাল অবস্থায় রয়েছে হাসপাতাল সড়ক।এ সড়ক দিয়ে হাসপাতালে যাতায়াতে প্রসূতিসহ বিভিন্ন রোগীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কোথাও ড্রেন থাকলেও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই, আবার কোথাও ড্রেনই নেই।প্রথম শ্রেণির গুরুদাসপুর পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়কের এমন বেহাল দশায় পৌরবাসীর দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। ভাঙা সড়কটি এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।অ্যাম্বুলেন্স ও রিকশা-ভ্যানে রোগী আনা-নেওয়ার সময় সড়কের ঝাঁকুনিতে তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যায়। জরুরি মুহূর্তে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।পৌর প্রশাসক ফাহমিদা আফরোজ ও পৌরসভার প্রধান প্রকৌশলী মো. আবু রায়হান বলেন, ‘কিছু রাস্তার টেন্ডার হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সড়ক ও ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। পরবর্তী সময়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টেন্ডারের মাধ্যমে বাকি সড়কগুলোর সংস্কার ও নির্মাণকাজ করা হবে।’সালথায় তিন যুগের পুরোনো সেতু ঝুঁকিপূর্ণ, ফরিদপুরের সালথায় এক যুগের বেশি সময় ধরে ভাঙা সেতুর ওপর দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের কাগদী বাজারসংলগ্ন সেতুটি প্রায় তিন যুগ আগে নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সেতুটির রেলিংয়ের কিছু অংশ শূন্যে ঝুলছে। বাজারের অংশে বাঁশের কঞ্চি ও ডালপালা দিয়ে রেলিং তৈরি করা হয়েছে। পলেস্তারা উঠে রড বেরিয়ে গেছে। কিছু রড ক্ষয়ে ও মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে।সেতুর মাঝের পাটাতন ক্ষয়ে নিচে পড়ে গেছে। ভাঙা অংশে কাঠ দিয়ে রাখা হয়েছে। মাঝের জোড়া পিলারও দেবে গেছে। পিলারের পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে পড়েছে। সেতুর ওপর অসংখ্য খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিনই ঘটছে ছোটখাটো দুর্ঘটনা। সব মিলিয়ে সেতুটি এখন পুরোপুরি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ ও যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে সেতুটি ব্যবহার করছেন। সেতুটি এতটাই সরু যে একটি ভ্যান পার হওয়ার সময় বিপরীত দিকের আরেকটি ভ্যানকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ছোট কোনো যানবাহন পার হলেও সেতু কেঁপে ওঠে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করা না হলে যেকোনো সময় সেতুটি ভেঙে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই সেখানে নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।স্থানীয় ইউপি সদস্য ও কাগদী গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান হাবিব জানান, ১৯৮৮ সালের বন্যার পর সেতুটি নির্মাণ করা হয়। এক যুগের বেশি সময় ধরে এটি ভেঙে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কখন সেতুটি ভেঙে পড়ে, সেই আতঙ্কে থাকেন সবাই। নতুন সেতু নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত এলাকাবাসীর উদ্বেগ কাটবে না।স্থানীয়রা জানান, কাগদী বাজারসংলগ্ন সেতু দিয়ে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী দুই পাড়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা, হাইস্কুল ও কিন্ডারগার্টেনে যাতায়াত করে। সেতু পার হয়ে কাগদী বাজার, মসজিদ, মন্দির, ভূমি অফিস ও ইউনিয়ন পরিষদেও যেতে হয়। দুই পাড়ের মানুষের জন্য অনেক ক্ষেত্রে এটিই একমাত্র চলাচলের মাধ্যম। বিশেষ করে হাটের দিনে কৃষিপণ্য ভ্যানে করে সেতু পার হতে গিয়ে চরম ঝুঁকি নিতে হয়।এ ছাড়া স্থানীয় কয়েক গ্রামের হাজারো মানুষ জেলা ও উপজেলা সদরে যাতায়াতের জন্য সেতুটি ব্যবহার করেন। সেতুটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ হিসেবে মাঝে মাঝে কর্মকর্তারা মাটি পরীক্ষা করে দ্রুত কাজ শুরুর আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত নির্মাণকাজ শুরুর কোনো লক্ষণ নেই।সালথা উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবু জাফর মিয়া বলেন, কাগদী বাজারসংলগ্ন সেতুটির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেতুটি মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। পাটাতন ও রেলিং খসে পড়েছে। এ ছাড়া সেতুটি খুবই সরু; একটির বেশি গাড়ি পার হতে পারে না। সেখানে নতুন সেতু নির্মাণের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের অনুমোদন পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।