সুপারইন্টেলিজেন্স নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, তবে ‘এআই বিশ্ব ধ্বংস করবে’—এমন আশঙ্কায় নেই ঐকমত্যকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) দ্রুত উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও বিশ্বজুড়ে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে নিজে নিজে কোড লেখা ও উন্নত হওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন ভবিষ্যৎ ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি গবেষকদের একাংশ।তাদের ধারণা, অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তার এআই ভবিষ্যতে বিভিন্ন সিস্টেমে প্রবেশ, সেগুলো নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের নির্দেশ অমান্য করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ‘এআইয়ের হাতে মানবজাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে’—এই সতর্কবার্তা সামনে এসেছে।তবে এ আশঙ্কা কতটা বাস্তব, তা নিয়ে বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি গবেষকদের মধ্যে কোনো ঐকমত্য নেই। এক পক্ষ এটিকে সম্ভাব্য ও গুরুতর ভবিষ্যৎ ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। অন্য পক্ষের মতে, এ ধরনের আশঙ্কা অনেকটাই কল্পবিজ্ঞাননির্ভর এবং বাস্তব ঝুঁকির তুলনায় অতিরঞ্জিত।কেন উদ্বিগ্ন গবেষকেরাবর্তমানের কিছু এআই সিস্টেম নিজে নিজে কোড তৈরি ও উন্নত করতে পারছে। এ কারণে গবেষকদের একটি অংশ আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতের সুপারইন্টেলিজেন্স হয়তো মানুষের দেওয়া নির্দেশ উপেক্ষা করে নিজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে।সম্প্রতি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের কিছু এআই এজেন্ট নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের সীমা অতিক্রম করে অন্য সার্ভারে প্রবেশের মতো আচরণ করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।গবেষক মার্ক ডেলির উদাহরণ, মানুষ যেমন পিঁপড়ার তুলনায় অনেক বেশি বুদ্ধিমান হওয়ায় পিঁপড়া মানুষের পরিকল্পনা বুঝতে পারে না, তেমনি মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি বুদ্ধিমান কোনো এআই তৈরি হলে তার উদ্দেশ্য ও কর্মকৌশল মানুষের পক্ষে বোঝা বা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।‘টার্মিনেটর’ ধরনের আশঙ্কা কতটা বাস্তবঅন্যদিকে অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক স্যান্ড্রা ওয়াকটার এবং এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংয়ের মতো বিশেষজ্ঞরা এআইয়ের হাতে পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কাকে অনেকটাই ‘টার্মিনেটর’ ধরনের কল্পকাহিনি হিসেবে দেখেন।তাদের যুক্তি, এআই মূলত অ্যালগরিদম ও ডেটার ওপর নির্ভরশীল। মানুষের মতো তার নিজস্ব চেতনা কিংবা মানুষকে ধ্বংস করার ইচ্ছা তৈরি হওয়ার বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।সমালোচকদের কেউ কেউ আরও মনে করেন, মানবজাতি ধ্বংসের কাল্পনিক আশঙ্কাকে সামনে এনে এআই কোম্পানিগুলো বর্তমানের বাস্তব সমস্যাগুলো থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করছে। এসব বাস্তব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ডিপফেক ও ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে নির্বাচন ও গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করা, মানুষের কর্মসংস্থানে চাপ সৃষ্টি এবং বিপুল কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি।ঝুঁকির তিন স্তরবর্তমান পরিস্থিতিতে এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদকে মোটামুটি তিনটি স্তরে দেখা হচ্ছে।বর্তমান স্তর—ঝুঁকি কম: চ্যাটজিপিটি বা গুগল জেমিনির মতো বর্তমান এআই টুলগুলো সরাসরি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি নয়।মধ্যবর্তী স্তর—ঝুঁকি মাঝারি: কোনো সন্ত্রাসী বা অপরাধী গোষ্ঠী এআই ব্যবহার করে জৈব অস্ত্র তৈরির চেষ্টা কিংবা বড় ধরনের সাইবার হামলা চালালে কোটি কোটি মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।ভবিষ্যৎ স্তর—ঝুঁকি অনিশ্চিত: সত্যিকারের সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরি হলে এবং সেটি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণসব মিলিয়ে এআই নিয়ে সতর্কবার্তাগুলো পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে ‘আগামীকালই এআই বিশ্ব ধ্বংস করে দেবে’—এমন আতঙ্ক ছড়ানোরও যৌক্তিকতা নেই। ভবিষ্যতের ঝুঁকি অনেকাংশে নির্ভর করবে মানুষ কীভাবে এ প্রযুক্তির উন্নয়ন, ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে তার ওপর।বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধ কিংবা পারমাণবিক প্রযুক্তির মতো এআইকেও যদি কঠোর আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় আনা যায়, তাহলে সম্ভাব্য ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।