সুফি সাধক ও কাদেরিয়া তরিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহান আলেম হজরত শেখ আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর স্মরণে রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে বিভিন্ন দেশে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ পালিত হয়ে আসছে। এ উপলক্ষে তাঁর জীবন, দ্বীনি শিক্ষা, সুন্নাহর অনুসরণ ও ইসলামি খেদমত নিয়ে আলোচনা, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া এবং ইসালে সওয়াবের আয়োজন করা হয়।চলতি বছর ১১ রবিউস সানি অনুযায়ী ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার দিবসটি পালিত হওয়ার কথা রয়েছে।‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ অর্থ কী‘ফাতিহা’ শব্দটি সাধারণভাবে দোয়া, মোনাজাত এবং কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে ইসালে সওয়াবের অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর ফারসি ‘ইয়াজদহম’ শব্দের অর্থ এগারো। সে হিসেবে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ বলতে রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর স্মরণে আয়োজিত ফাতিহা ও ইসালে সওয়াবের মাহফিলকে বোঝানো হয়।প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হিজরি ৫৬১ সালের ১১ রবিউস সানি (১১৬৬ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি বাগদাদে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মাজারও বাগদাদে অবস্থিত।কে ছিলেন আবদুল কাদির জিলানিহজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ৪৭০ হিজরিতে (প্রায় ১০৭৭-৭৮ খ্রিষ্টাব্দ) জিলান অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জ্ঞানার্জনের জন্য বাগদাদে যান। সেখানে তাফসির, হাদিস, ফিকহসহ বিভিন্ন ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং একজন প্রভাবশালী আলেম ও আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।কাদেরিয়া সুফি ধারার সঙ্গে তাঁর নাম বিশেষভাবে যুক্ত। সুফি ঐতিহ্যে তাঁকে ‘গাউসুল আজম’ ও ‘বড়পীর’ নামেও অভিহিত করা হয়।তাঁর নামে প্রচলিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘গুনিয়াতুত তালিবিন’, ‘ফাতহুল গাইব’ ও ‘আল-ফাতহুর রাব্বানি’। এসব রচনায় আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, নৈতিকতা ও আল্লাহর আনুগত্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।কেন পালিত হয়ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম উপলক্ষে তাঁর জীবন ও দ্বীনি অবদান স্মরণ করা হয়। পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, দান-সদকা ও দোয়ার মাধ্যমে ইসালে সওয়াবের আয়োজন করেন অনুসারীরা।মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও সদকার বিষয়ে সহিহ হাদিসে বলা হয়েছে, মানুষ মৃত্যুবরণ করার পর তার আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে—এসবের সওয়াব অব্যাহত থাকে।(সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১)বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে শিক্ষার ওপর গুরুত্বফাতিহা-ই-ইয়াজদহমকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় আলোচনা ও দোয়া-মাহফিলের আয়োজন হলেও আলেমদের একটি অংশ অতিরিক্ত আড়ম্বর, অপচয় কিংবা অননুমোদিত আনুষ্ঠানিকতা থেকে বিরত থাকার ওপর গুরুত্ব দেন।তাদের মতে, কোনো মনীষীকে স্মরণ করার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তাঁর জীবন ও শিক্ষার ভালো দিকগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া। আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জীবন থেকে সততা, আমানতদারি, আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের শিক্ষা গ্রহণ করাই এ উপলক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দিক।পবিত্র কোরআনে আল্লাহর নেক বান্দাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর অলিদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবেন না।’(সুরা ইউনুস, আয়াত ৬২)সুতরাং ফাতিহা-ই-ইয়াজদহমকে ঘিরে আয়োজনের পাশাপাশি আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জীবন, দ্বীনি শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির বার্তা ব্যক্তিজীবনে অনুসরণ করাই এ স্মরণ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন—সুরা ইউনুস, আয়াত ৬২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১।