রাজধানীর সহিংসতা-দখলবাজি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, কঠোর অভিযানের নির্দেশরাজধানীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি সহিংসতা, দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক ভাঙচুর, এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কার্যালয়ে হামলা, আদাবরে বাড়িতে হামলা এবং মোহাম্মদপুরে জমি দখল ও ভাঙচুরের মতো ঘটনায় সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি—এমন আলোচনা হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে।মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে পুলিশের ভূমিকা, মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমাবদ্ধতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালীদের চাপের কারণে কিছু ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে সতর্ক ছিল—এমন বক্তব্যও উঠে আসে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাজধানীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে কোথায় ভুলত্রুটি হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে পুলিশের করণীয় কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে আলোচনা হয়।রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগবৈঠকে অংশ নেওয়া দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক সমর্থন বা স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে প্রভাবশালী অপরাধীদের বিরুদ্ধে পুলিশ অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধায় পড়ে। বিশেষ করে মিরপুরে ক্লিনিক ভাঙচুরের ঘটনায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকায় মাঠপর্যায়ের পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় চাঁদাবাজি, দখল, মাদক কারবারসহ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে আরও সক্রিয় হওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নমনীয়তা না দেখানোর নীতিগত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।এর পাশাপাশি মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায়ও দেশের সব পুলিশ ইউনিটকে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি ও অন্যান্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নরাজধানীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিষয়ে ডিএমপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কিছু ঘটনার আকস্মিকতা এবং তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতির কারণে মাঠপর্যায়ের পুলিশ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।তবে মিরপুর ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সময়মতো অবহিত করেছিলেন কি না এবং করে থাকলে কী ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল—এ বিষয়ে বৈঠকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।ক্লিনিক ভাঙচুরের মতো ঘটনায় শুধু সংশ্লিষ্ট থানার ওসি বা ডিভিশনের ডিসির ভূমিকা নয়, ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে। সম্ভাব্য আগাম গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি, সেই প্রশ্নও উঠেছে।২৪ ঘণ্টা মনিটরিং জোরদারবৈঠকে পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন বিভাগে চালু থাকা মনিটরিং কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় ও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সারা দেশে চলমান বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়।বৈঠকে রাজধানীর জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা নিয়েও আলোচনা হয়। কর্মকর্তারা বলেন, ঢাকার মতো বিশাল মহানগরে প্রায় ৩৫ হাজার পুলিশ সদস্য দিয়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এ অবস্থায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।এ জন্য কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম নতুনভাবে জোরদার করার প্রস্তাবও আসে।মাদক ও জমি দখলের বিরুদ্ধে নির্দেশনামাদকসেবীদের পাশাপাশি মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।এ ছাড়া জমি নিয়ে বিরোধ ও দখলসংক্রান্ত অভিযোগগুলো আইনগত কাঠামোর মধ্যে থেকে মোকাবিলা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনাবৈঠকের এক পর্যায়ে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ধরন নিয়েও মন্তব্য করেন। তাদের বক্তব্য, পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি ঘটলেই পুলিশকে পুরোপুরি ব্যর্থ হিসেবে উপস্থাপন করে একপেশে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।অন্যদিকে কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা থাকলেও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে এবং পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।বৈঠকে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।কিশোর গ্যাং ও দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় জোরপুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং আগস্ট মাসের অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়।আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের সভাপতিত্বে সভায় অতিরিক্ত আইজিপি মো. সায়েদুর রহমান, সব মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপাররা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।সভায় আইজিপি মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই। একই সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন, আসন্ন দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ঠেকাতে সাইবার মনিটরিং জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়।অতিরিক্ত আইজি সায়েদুর রহমান কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী মদদদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন। দুর্গাপূজার নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং পুলিশ সদস্যদের বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের বিষয়েও তিনি নির্দেশনা দেন।এ ছাড়া আগস্ট মাসের অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে গুরুতর মামলার তদন্তের অগ্রগতি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল এবং মামলায় সাজা নিশ্চিতের হার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।