রাজনৈতিক পালাবদল, কর্মসংকট ও বিনিয়োগ ঘাটতিতে কমেছে পরিচিত মুখের উপস্থিতি একসময় নাটক, সিনেমা, গান ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই পরিচিত তারকাদের ব্যস্ত উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশের বিনোদন অঙ্গনে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। রাজনৈতিক পালাবদল, শিল্পীদের বিদেশে অবস্থান, কাজের সংকট, বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং দর্শক হারানোর মতো নানা কারণে পরিচিত মুখের উপস্থিতি কমেছে।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিনোদন অঙ্গনের একাংশের শিল্পী ও সংগঠক জনসম্মুখ থেকে সরে যান। কারও বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনবিরোধী অবস্থানের অভিযোগ ওঠে, কারও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। আবার অনেকে দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও বিনোদন অঙ্গনের সেই শূন্যতা পুরোপুরি কাটেনি।রাজনীতির প্রভাবচলচ্চিত্র অঙ্গনে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে পরিচিত কয়েকজন তারকার অনুপস্থিতি। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ডিপজল, নিপুণ আক্তার ও জায়েদ খানসহ কয়েকজনের প্রকাশ্য তৎপরতা কমে যায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সংসদ সদস্য চিত্রনায়ক ফেরদৌসও দেশ ছাড়েন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি প্রথমে ভারতে এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে যান।অভিনেতা রিয়াজও দীর্ঘ সময় আড়ালে ছিলেন। অন্যদিকে জায়েদ খান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে স্টেজ শো ও উপস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি ও অভিনেতা সাইমন সাদিকও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনার আগে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য, প্রেক্ষাপট ও আইনি অবস্থান যাচাই করা প্রয়োজন।দেশে থেকেও কয়েকজন পরিচিত শিল্পী ধীরে ধীরে কাজে ফিরছেন। তাঁদের মধ্যে চঞ্চল চৌধুরী, আরেফিন শুভ, নুসরাত ফারিয়া ও আজিজুল হাকিমের নাম রয়েছে।বিদেশে তারকারাশুধু রাজনৈতিক পরিস্থিতিই শিল্পীদের বিদেশমুখী হওয়ার কারণ নয়। কাজের সংকট, আয় কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তাও অনেকের বিদেশে অবস্থানের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।বিদেশে থাকা শিল্পীদের তালিকায় আফরোজা বানু, লুৎফনাহার লতা, শিরিন বকুল, তৌকীর আহমেদ, বিপাশা হায়াত, মৌসুমী, টনি ডায়েস, প্রিয়া ডায়েস, তমালিকা কর্মকার, হিল্লোল, নওশীন, রিয়া চৌধুরী, স্বাধীন খসরু, রিচি সোলায়মান, শ্রাবন্তী, বিপ্লব (প্রমিথিউস), দিনাত জাহান মুন্নী, কাজী মারুফ, শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নি, অগ্নীলা, আমব্রিন, শাবনূর, তামান্না, মোনালিসা, রোমানা, ইবরার টিপু, জেকে মজলিশ, লিটু আনাম, অমিত হাসান, ইমন, সোনিয়া হোসেন ও রেশমী মির্জাসহ আরও অনেকে রয়েছেন।কাজের সংকট বাড়ছেবিনোদন অঙ্গনের সংকট যে শুধু রাজনৈতিক কারণে তৈরি হয়নি, তার প্রমাণও মিলছে শিল্পী ও নির্মাতাদের বক্তব্যে। ২০২৫ সালে নাট্যাঙ্গনের সংকট নিয়ে একাধিক শিল্পী-নির্মাতা কাজের অভাবের কথা জানান। অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদ জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ ১১ মাস তিনি কোনো কাজ পাননি।সংশ্লিষ্টদের মতে, ঈদের পর মৌসুমি মন্দা, বর্ষায় আউটডোর শুটিং কমে যাওয়া এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সংকট আরও দীর্ঘ হয়েছে। ২০২৬ সালেও বিনিয়োগের ঘাটতি, কম বাজেট, স্পনসর কমে যাওয়া এবং শিল্পীদের অন্য মাধ্যমে চলে যাওয়ার প্রভাব রয়েছে নাটকের বাজারে।বড় তারকাদের কেউ সিনেমা ও ওটিটিতে ব্যস্ত, কেউ বিদেশে, আবার কেউ নিয়মিত নাটকে ফিরছেন না। এতে ছোট পর্দায় পরিচিত মুখের সংকট আরও স্পষ্ট হয়েছে।সিনেমাতেও মন্দাচলচ্চিত্রেও পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫ সালে প্রায় অর্ধশত সিনেমা মুক্তি পেলেও ব্যবসায়িক সাফল্য মূলত কয়েকটি বড় ঈদকেন্দ্রিক ছবিকে ঘিরে ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দর্শক সংকট ও প্রেক্ষাগৃহের দুরবস্থার পাশাপাশি শিল্পীদের বিদেশে অবস্থানও সংকটকে দৃশ্যমান করেছে।টেলিভিশন ধারাবাহিকেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একসময় সারা বছর ধারাবাহিকে ব্যস্ত থাকা অনেক শিল্পী এখন নিয়মিত ধারাবাহিকে কাজ করছেন না। এতে দর্শকের একটি অংশও টেলিভিশন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের মত।ফিরতে হবে আস্থা ও কর্মপরিবেশবিনোদন অঙ্গনের বর্তমান সংকটকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। শিল্পীদের কাজের সুযোগ, বিনিয়োগ, প্রেক্ষাগৃহ, নির্মাণ ব্যয়, স্পনসরশিপ, দর্শক এবং নতুন শিল্পীদের জায়গা করে দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীতের দলীয় সম্পৃক্ততা নিজেই কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট ও আইনি অবস্থান যাচাই জরুরি।বর্তমানে নতুন মুখের পাশাপাশি ওটিটি কনটেন্ট ও মঞ্চনাটকে কাজ হচ্ছে। তবে একসময় যে তারকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি দেশের বিনোদন বাজারকে প্রাণবন্ত রাখত, তা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি।ফলে দেশের বিনোদন অঙ্গনের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—বিদেশে থাকা শিল্পীরা কবে ফিরবেন, আড়ালে থাকা তারকারা আবার নিয়মিত হবেন কি না এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা কতটা জায়গা করে নিতে পারবেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বিনোদন শিল্পের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে তারকা-শূন্যতা কাটানো কঠিন হতে পারে।