বর্ষা শেষে রাঙামাটিতে শুরু হয়েছে পর্যটনের ভরা মৌসুম। কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলরাশি, সবুজ পাহাড়, ঝরনার কলতান ও মেঘের আনাগোনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটছেন পাহাড়ি এ জনপদে। সাজেকসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও বাড়ছে দর্শনার্থীর সংখ্যা। পর্যটকের আনাগোনায় প্রাণ ফিরেছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও।তবে পর্যটন মৌসুম জমে উঠলেও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারি উদ্যোগ ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।ঝুলন্ত সেতু পানির নিচেরাঙামাটির অন্যতম আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী ঝুলন্ত সেতু। কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় সেতুটির প্রায় ৮ ইঞ্চি অংশ এখনো পানিতে তলিয়ে রয়েছে। ফলে পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় সেতুতে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।তবে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কিছু পর্যটক সেতুতে ওঠার চেষ্টা করছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের অনেকে সেতুটি দেখতে না পেরে হতাশ হচ্ছেন।তবে সেতু সংলগ্ন পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স এলাকায় দর্শনার্থীর ভিড় রয়েছে। পলওয়েল পার্ক, আরণ্যক, কাপ্তাই হ্রদে নৌভ্রমণ, সুবলং ঝরনা, পেদা টিংটিং, চাংপাং ও বরগাঙসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও বাড়ছে পর্যটকের উপস্থিতি। বর্ষার প্রভাবে ঝরনাগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত পানি থাকায় প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন দর্শনার্থীরা।সুবিধার ঘাটতি, থমকে উন্নয়নসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে রাঙামাটিতে নতুন অবকাঠামো ও বিনোদন সুবিধা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি রয়েছে। রাঙামাটি পর্যটন মোটেলে নতুন ভবন নির্মিত হলেও সুইমিংপুল, শিশুদের বিনোদন পার্ক, ক্যাবলকার, মানসম্মত ওয়াশরুম ও নিরাপদ নৌঘাটের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা পর্যাপ্ত নয়।রাঙামাটি পর্যটন মোটেল ও হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, সরকারি উদ্যোগ একেবারে নেই—এমন নয়। জেলা পরিষদের সহায়তায় হলিডে কমপ্লেক্সে কিছু সংস্কারকাজ চলছে। তবে বরাদ্দের কারণে আপাতত কাজ বন্ধ রয়েছে। সুইমিংপুল ও ক্যাবলকারসহ আরও কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।এদিকে রাঙামাটি সদরে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘অ্যাক্সক্লুসিভ পর্যটন জোন’ প্রকল্প নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পর্যটন বোর্ডের ৬৩০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ২০২২ সালে একটি দল রাঙামাটি পরিদর্শন করলেও পরে এর অগ্রগতি সম্পর্কে আর জানা যায়নি।‘লুসাই পাহাড়ে পর্যটন উন্নয়ন’ নামে তিন কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে কাজ শুরুর কথা থাকলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের অর্থ ভুয়া বিলের মাধ্যমে উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে। তবে প্রকল্পটি বাতিল হয়নি এবং চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কান্তি দেওয়ান।বিদেশি পর্যটক নিয়েও বাধাপর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশি পর্যটকদের প্রবেশসংক্রান্ত কঠোর নীতিমালাও রাঙামাটির পর্যটন সম্ভাবনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অনেক বিদেশি পর্যটক জটিলতার কারণে রাঙামাটি ভ্রমণ করতে পারেন না। নীতিমালা সহজ করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করেন তারা।ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব রাঙামাটির (টোয়ার) সভাপতি ও গর্বা সংস্থার স্বত্বাধিকারী মো. বাদশা ফয়সাল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাঙামাটির পর্যটন সম্ভাবনার কথা বলা হলেও সে অনুযায়ী নতুন আকর্ষণ তৈরি হয়নি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সঠিক পরিকল্পনা ও সহজ শর্তে ঋণের অভাবে স্থানীয় উদ্যোক্তারাও কাঙ্ক্ষিতভাবে এগোতে পারছেন না। দীর্ঘ সময়েও ঝুলন্ত সেতু ছাড়া উল্লেখযোগ্য নতুন আকর্ষণ গড়ে ওঠেনি।তিনি বিদেশি পর্যটকদের জন্য নীতিমালা সহজ করা, কাপ্তাই হ্রদ খনন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, শহরের প্রবেশমুখের ময়লার ভাগাড় অপসারণ এবং পর্যটন উন্নয়নে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করার দাবি জানান।পর্যটক বাড়ায় স্বস্তি ব্যবসায়ীদেরপর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় কয়েক মাসের মন্দা কাটিয়ে স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে। বোটচালক, হস্তশিল্প বিক্রেতা এবং হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুকিং বাড়ছে। স্থানীয় তাঁতশিল্প, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রতিও পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে।সংশ্লিষ্টদের মতে, কাপ্তাই হ্রদ, পাহাড়, ঝরনা ও পাহাড়ি সংস্কৃতিকে ঘিরে রাঙামাটিতে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, হ্রদের নাব্যতা ও পরিবেশ রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং আধুনিক পর্যটনসেবা নিশ্চিত করা গেলে এ সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।