জলবায়ু পরিবর্তন, নতুন রোগ-পোকার আবির্ভাব, মাটির উর্বরতা হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কীটনাশকের প্রতিরোধক্ষমতা—সব মিলিয়ে কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। এ পরিস্থিতিতে ফসলের রোগবালাই ও উৎপাদনসংক্রান্ত সমস্যায় সঠিক, সময়োপযোগী ও নিরপেক্ষ কৃষি পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। তবে বাস্তবে অনেক কৃষক কৃষি কর্মকর্তার পরিবর্তে স্থানীয় কৃষি উপকরণ ও কীটনাশক বিক্রেতার কাছ থেকেই পরামর্শ নিচ্ছেন। এতে বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রভাব কৃষি পরামর্শব্যবস্থায় ঢুকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জমিতে পোকা, রোগ, পাতা হলুদ হয়ে যাওয়া, গাছের বৃদ্ধি কমে যাওয়া কিংবা ফলন কমার কারণ সব সময় কীটপতঙ্গের আক্রমণ নয়। পুষ্টির ঘাটতি, অতিরিক্ত পানি, মাটির পিএইচ, আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব কিংবা ভুল কৃষি ব্যবস্থাপনাও এসব সমস্যার কারণ হতে পারে। অথচ সঠিক কারণ শনাক্ত না করে সরাসরি কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ফসল, মাটি ও পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে।দোকানেই মিলছে তাৎক্ষণিক পরামর্শফসলের সমস্যা দেখা দিলে কৃষক সাধারণত দ্রুত সমাধান চান। বাজারে কৃষি উপকরণের দোকান সহজে পাওয়া যায় এবং সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো একটি পণ্যের নাম ও ব্যবহারের পরামর্শও মেলে। অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণকর্মীদের জনবল সংকট, বড় কর্মএলাকা ও বিপুলসংখ্যক কৃষকের কারণে প্রতিটি কৃষকের কাছে নিয়মিত সেবা পৌঁছানো সব সময় সম্ভব হয় না।ফলে মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছে কৃষি কর্মকর্তার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীই বেশি সহজলভ্য হয়ে উঠেছেন। এ বাস্তবতায় কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের শুধু ব্যবসায়ী হিসেবে না দেখে প্রশিক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত কৃষি-পরামর্শ সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, জ্ঞান যাচাই, সনদায়ন ও যথাযথ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি।‘পোকা দেখলেই কীটনাশক’ নয়কীটনাশক কৃষি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত ব্যবহার কৃষকের ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি উপকারী পোকামাকড় ধ্বংস, বালাইনাশক-প্রতিরোধী পোকার বিস্তার এবং খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।একই সক্রিয় উপাদান বা একই ধরনের কার্যপ্রণালির কীটনাশক বারবার ব্যবহার করলে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির আশঙ্কা বাড়ে। তখন কৃষক আরও বেশি মাত্রায় বা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী পণ্য ব্যবহারের দিকে যেতে পারেন। এতে একটি ক্ষতিকর দুষ্টচক্র তৈরি হয়।কৃষিক্ষেত্রে থাকা সব পোকাও ক্ষতিকর নয়। পরাগায়নকারী, শিকারি ও পরজীবীসহ অনেক পোকা কৃষির জন্য উপকারী। নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ করলে ক্ষতিকর পোকার পাশাপাশি এসব উপকারী জীবও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে প্রাকৃতিকভাবে পোকার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।তাই প্রথমে রোগ বা পোকার সঠিক শনাক্তকরণ, ফসলের বয়স, আবহাওয়া, মাটির অবস্থা, আগে ব্যবহৃত বালাইনাশক এবং আক্রান্তির মাত্রা বিবেচনা করা প্রয়োজন। এরপর সাংস্কৃতিক, যান্ত্রিক, জৈবিক এবং প্রয়োজন হলে রাসায়নিক পদ্ধতির সমন্বয়ে বালাই ব্যবস্থাপনা করা উচিত।ডিজিটাল কৃষি পরামর্শে নতুন সম্ভাবনাকৃষকদের কাছে দ্রুত ও নিরপেক্ষ পরামর্শ পৌঁছে দিতে ডিজিটাল কৃষি সেবার সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে কৃষক ফসলের ছবি, জমির তথ্য, অবস্থান ও আবহাওয়ার তথ্য দিয়ে রোগ-পোকার প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং করণীয় জানতে পারেন।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আবহাওয়ার তথ্য, মাটি পরীক্ষা, আইওটি সেন্সর এবং কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ সমন্বয় করে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে প্রযুক্তিকে মাঠকর্মী বা বিশেষজ্ঞের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।একই সঙ্গে কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দোকানের লাইসেন্স নবায়নের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও সনদায়ন যুক্ত করা হলে দায়িত্বশীলতা বাড়তে পারে। কোন রোগে কোন পণ্য প্রয়োজন, কখন প্রয়োগ করতে হবে, কত মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে এবং কত দিন অপেক্ষার পর ফসল বাজারজাত করা নিরাপদ—এসব বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান ছাড়া পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।কৃষকের হাতে পণ্যের আগে পৌঁছাতে হবে জ্ঞানকৃষকের ভুল সিদ্ধান্তের দায় কেবল কৃষকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য তাকে সহজলভ্য, নির্ভরযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক তথ্য দিতে হবে। কৃষক যদি কৃষি কর্মকর্তার পরিবর্তে বাণিজ্যিক উৎসের ওপর বেশি নির্ভর করতে বাধ্য হন, সেটি কৃষকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতার চেয়ে কৃষি সম্প্রসারণ ও জ্ঞানসেবা ব্যবস্থার দুর্বলতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।তাই সমাধান হিসেবে ব্যবসায়ীদের বাদ দেওয়ার পরিবর্তে তাদের প্রশিক্ষিত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন। মাঠকর্মী, গবেষক, প্রশিক্ষিত কৃষি উপকরণ বিক্রেতা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও কৃষক—সব পক্ষকে সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে।প্রতিটি ইউনিয়ন ও বাজার পর্যায়ে সহজে কৃষি পরামর্শ পাওয়ার ব্যবস্থা, কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সনদায়ন, বালাইনাশক ব্যবহারে প্রয়োজনভিত্তিক নির্দেশনা, রোগ-পোকার সঠিক শনাক্তকরণ এবং ডিজিটাল কৃষি পরামর্শব্যবস্থার সম্প্রসারণ জরুরি।কারণ ভুল পরামর্শের ক্ষতি শুধু একটি ভুল পণ্য কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে কৃষকের অর্থ, ফসল, মাটি, পরিবেশ এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার খাদ্যনিরাপত্তা জড়িত। কৃষকের প্রয়োজন শুধু কোনো কীটনাশকের নাম নয়; প্রয়োজন সমস্যার সঠিক কারণ শনাক্ত করে কার্যকর ও নিরাপদ সমাধানের নির্দেশনা। কৃষকের হাতে পণ্য তুলে দেওয়ার আগে তাই নিশ্চিত করতে হবে—সবার আগে পৌঁছেছে সঠিক কৃষি জ্ঞান।