বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং জনসচেতনতা তৈরিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী পরিবেশবাদী যুবসংগঠন গ্রীন ভয়েস। পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় সংগঠনটি। প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ রোধ, বন উজাড় বন্ধ, নদী-নালা, খাল-বিল, খেলার মাঠ ও পার্ক দখলমুক্ত রাখাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জনসম্পৃক্ততা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে তারা।যেভাবে শুরু২০০৫ সালে দেশে নির্বিচারে গাছ কাটা, নদী-নালা ও জলাশয় দূষণ এবং প্লাস্টিক-পলিথিনের অতিরিক্ত ব্যবহারের বিরুদ্ধে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ থেকেই গ্রীন ভয়েসের পথচলা শুরু। পরিবেশ, শব্দদূষণ ও পানিদূষণের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০৫ সালের ১৮ এপ্রিল সংগঠনটির কার্যক্রম শুরু হয়।পরিবেশ সচেতন সংগঠক মো. আলমগীর কবির ও কয়েকজন দূরদর্শী তরুণের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হয়। বর্তমানে পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছে সংগঠনটি।নারী ও শিশু অধিকারেও উদ্যোগপরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি একটি সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, অধিকার ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রীন ভয়েসের অঙ্গসংগঠন হিসেবে ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করে ‘বহ্নিশিখা’।সংগঠনটির লক্ষ্য নারীদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও জ্ঞানগত বিকাশের পাশাপাশি তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে নারীর অধিকার, নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের বিষয়গুলোকে পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গে সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকেই বহ্নিশিখার কার্যক্রম শুরু হয়।সাত কর্মপরিধিতে নারীর ক্ষমতায়নবহ্নিশিখা সাতটি মূল কর্মপরিধির মাধ্যমে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে আত্মনির্ভরশীলতা, সমাজবিদুষী, আলোকিত নারী, প্রযুক্তিপূর্ণতায় নারী, বলীয়ান নারী, পরসেবায় নারী ও ন্যায়পাল নারী।আত্মনির্ভরশীলতা কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। দক্ষতা ও যোগ্যতার বিকাশের মাধ্যমে নারীদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করাই এর লক্ষ্য।সমাজবিদুষী কর্মসূচির লক্ষ্য পিছিয়ে পড়া নারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী করে তোলা। কুসংস্কার ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারীদের সচেতন ভূমিকা রাখার সক্ষমতা তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।আলোকিত নারী কর্মসূচিতে শিক্ষা, জ্ঞান, নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে নারীদের সমাজ পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার আদর্শকে সামনে রেখে নারীর শিক্ষা ও নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।প্রযুক্তিপূর্ণতায় নারী কর্মসূচির আওতায় নারীদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ রয়েছে। অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সেবা গ্রহণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরিই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।বলীয়ান নারী কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ও মানসিক দৃঢ়তা তৈরিতে কাজ করা হয়। পাশাপাশি পাবলিক স্পিকিং, উপস্থাপনা, অনুষ্ঠান পরিচালনা ও দল পরিচালনার মতো বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।পরসেবায় নারী কর্মসূচির লক্ষ্য সংকটে থাকা নারীদের পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং মানসিকভাবে সাহস জোগানো। প্রয়োজনে অসহায় নারীদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সহযোগিতা করা হয়।আর ন্যায়পাল নারী কর্মসূচির মাধ্যমে নারী ও শিশু অধিকারবিষয়ক আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং আইনগত অধিকার সম্পর্কে নারীদের ধারণা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বানগ্রীন ভয়েসের কর্মকাণ্ডে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংগঠনটির কর্মীদের মতে, একটি গাছ কেবল একটি গাছ নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়, মানুষের ছায়া ও একটি জনপদের স্মৃতি। একইভাবে একটি খেলার মাঠ হারিয়ে গেলে শুধু একটি জায়গা হারায় না, হারিয়ে যায় একটি প্রজন্মের শৈশবের স্মৃতিও।তাই পরিবেশ ও সমাজ রক্ষায় তরুণ প্রজন্মকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। নদী, জলাশয় ও বৃক্ষ রক্ষা এবং একই সঙ্গে নারী ও শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি নিরাপদ, মানবিক ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছে গ্রীন ভয়েস ও এর সহযোগী সংগঠন বহ্নিশিখা।
প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা করা গেলে তবেই টিকে থাকবে জনপদ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রা—এমন লক্ষ্যেই সবুজ ভবিষ্যৎ নির্মাণে কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি।