মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতি সম্পর্কে দেশটির পরিবারগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক হয়ে পড়েছে। ফলে অক্টোবরের শুরুর দিকে মার্কিন ভোক্তাদের আস্থার সূচক আরো কমে সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে এসেছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এটি আরো একটি দুঃসংবাদ।সম্প্রতি দেশটিতে পরিচালিত জরিপগুলোর মধ্যে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সার্ভিস অব কনজ্যুমারস’ (ভোক্তা জরিপ) থেকে এ তথ্য জানা গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ নেওয়ার বাড়তি খরচের কারণে মার্কিনিদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে হতাশাজনক মনোভাব এ জরিপে উঠে এসেছে। খবর রয়টার্সেরজরিপ অনুযায়ী, অর্থনীতি পরিচালনা নিয়ে উদ্বেগের জেরে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তার রাজনৈতিক জীবনের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। আগামী মাসের নির্বাচনে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে।রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। এর মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সুদের হার বাড়িয়েছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ।গত শুক্রবার মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, চলতি মাসে স্বল্প আয়ের ভোক্তা এবং যাদের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ কম, তাদের আস্থার সূচকে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বা নিজেদের স্বতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দেন—এমন মার্কিনিদের মধ্যেও আস্থা কমেছে। যদিও ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে আস্থার সূচক কিছুটা বেড়েছে, সামগ্রিক আস্থা এ বছরের শুরুর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম রয়েছে।প্ল্যান্ট মোরান ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজারসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা জিম বেয়ার্ড বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সব ধরনের ভোক্তাই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং আর্থিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় হতাশ। জিডিপির প্রধান পরিসংখ্যানে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট না-ও হতে পারে। তবে আগামী সপ্তাহগুলোতে ভোটারদের ভোট দেওয়ার সময় অর্থনৈতিক অসন্তোষের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা আস্থার সূচক সেপ্টেম্বরে ৪৮.১ থাকলেও অক্টোবরে কমে ৪৬.৩-এ নেমে এসেছে। টানা তৃতীয় মাসের মতো সূচকটির পতন ঘটেছে। এতে ভোক্তাদের মনোভাব মে মাসে দেখা সর্বকালের সর্বনিম্ন রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অবশ্য রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা সূচকটি ৪৭.৮ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।জরিপে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিমাপক সূচক সেপ্টেম্বরে ৫০.৯ থাকলেও অক্টোবরে কমে সর্বকালের সর্বনিম্ন ৪৪.৭-এ নেমে এসেছে। ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভোক্তাদের প্রত্যাশা কিছুটা উন্নত হলেও উচ্চ মূল্য ও ঋণের ব্যয়ের কারণে গাড়ি বা বড় গৃহস্থালি সরঞ্জাম কেনার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।এদিকে শেয়ারবাজারের ভালো পারফরম্যান্সের কারণে উচ্চ আয়ের পরিবারগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও মধ্য ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর বাজেটে চাপ বেড়েছে।মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক এক প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, যেসব পণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে, আগামী এক বছরও সেগুলোর পেছনে স্বাভাবিক হারে ব্যয় চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন এক-তৃতীয়াংশের কম ভোক্তা। অন্যদিকে, ৫৪ শতাংশ ভোক্তা ব্যয় কমিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। আর প্রায় ১৬ শতাংশ এসব পণ্য কেনা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলেছেন। নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের তুলনায় উচ্চ আয়ের ভোক্তাদের ব্যয় বজায় রাখার প্রবণতা বেশি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ হয়েছে।নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান আইএনজির প্রধান আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ জেমস নাইটলি বলেন, শেয়ারবাজার স্থিতিশীল থাকলে ভোক্তাদের ব্যয় অব্যাহত থাকতে পারে। এতে জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতির জন্য কিছুটা সময় পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। জ্বালানির দাম কমলে গাড়ির জ্বালানি ব্যয়ে স্বস্তি ফিরতে পারে এবং বৃহত্তর অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।ভোক্তা জরিপের তথ্য অনুযায়ী, আগামী এক বছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ে ভোক্তাদের প্রত্যাশা সেপ্টেম্বরে ৪.৬ শতাংশ থাকলেও অক্টোবরে সামান্য বেড়ে ৪.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ইরান সংঘাত শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে এ হার ছিল ৩.৪ শতাংশ। অর্থাৎ, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মূল্যস্ফীতি নিয়ে প্রত্যাশা বেড়েছে ১.৩ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ে ভোক্তাদের প্রত্যাশাও সেপ্টেম্বরে ৩.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে অক্টোবরে ৩.৫ শতাংশ হয়েছে।মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ গত সেপ্টেম্বরে নীতিসুদ ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৩.৭৫ থেকে ৪.০০ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করেছে। তিন বছরের মধ্যে এটিই ছিল সুদের হার বাড়ানোর প্রথম ঘটনা। ব্যাংকটি আগামী মাসগুলোতে ঋণ গ্রহণের খরচ আরো বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।তবে সেপ্টেম্বরে প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান না বাড়া এবং জুলাই ও আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশার চেয়ে কম থাকায় অক্টোবরে সুদের হার আবার বাড়ানোর সম্ভাবনা কমেছে। তবে ডিসেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াতে পারে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতিবিদদের একাংশ।