দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভীতির পরিবেশ, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিকীকরণের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাট্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। তাঁদের মতে, লোকজ সংস্কৃতির চর্চা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংস্কৃতির দূরত্ব বাড়ছে। সমাজের অস্থিরতা দূর করতে এবং সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিত করতে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি।রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে নাট্যসংগঠন ‘নাট্যকেন্দ্র’র তিন দশক পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক উন্মুক্ত আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এ আলোচনায় দেশের বর্তমান সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সংস্কৃতিচর্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে মতামত তুলে ধরা হয়।সংস্কৃতির বিকাশে বাধা অস্থিরতা ও বিভাজনআলোচনায় নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে সংস্কৃতি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সঙ্গে সংস্কৃতির বিষয় নিয়ে আলোচনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।তিনি বলেন, সমাজ ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে, অথচ সেখানে সংস্কৃতির আলো পৌঁছাচ্ছে না। নাচ, গান ও কবিতার প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। লেখকদের হিন্দু-মুসলমান পরিচয়ে ভাগ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কে বাংলাদেশি আর কে ভিনদেশি—এমন বিভাজনও তৈরি করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।মোহাম্মদ বারী বলেন, দেশ ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুখে কালিমা লেপনের ঘটনাও প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের অনেক ক্ষেত্রে কেবল ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকতে হচ্ছে।প্রতিবাদ থেমে নেই, কোথাও চলছে গোপনেনাট্যকার মাসুম রেজা বলেন, বর্তমান সময়েও মবের বিরুদ্ধে থিয়েটারকর্মীরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের মুখে কালিমা লেপনের ঘটনার বিপরীতে একজন রিকশাচালকের পানি এনে তা পরিষ্কার করার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি।মাসুম রেজার ভাষ্য, কুষ্টিয়ায় হারমোনিয়াম বাজছে, গানও হচ্ছে; তবে অনেক ক্ষেত্রে তা গোপনে করতে হচ্ছে। তাই সংস্কৃতিচর্চা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অস্তিত্ব নেই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।রাষ্ট্রীয় ভীতি ও বাণিজ্যিকীকরণের প্রভাববাবুল বিশ্বাস বলেন, প্রথমে রাষ্ট্র ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। এরপর করপোরেট ও এনজিও সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষ নিজের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক দুর্বল হয়।নাট্যব্যক্তিত্ব কচি খন্দকারের মতে, সংস্কৃতি যখন রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন বিপর্যয় দেখা দেয়। এর পরিণতিতে সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথের মুখে কালিমা লেপনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই দাগ কি আমাদের গায়েও এসে লেগেছে?অন্যদিকে, আখতারুজ্জামান বলেন, তাঁরা এখন অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছেন। কী লেখা যাবে আর কী লেখা যাবে না—তা ভাবতেই অনেক সময় চলে যায়। আগে প্রতিদিন সন্ধ্যায় নাটক নিয়ে আড্ডা হতো, কিন্তু অনিশ্চয়তার কারণে সেই পরিবেশও আগের মতো নেই।মূল প্রবন্ধে সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার বিশ্লেষণঅনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তৌকীর আহমেদ। প্রবন্ধটি উপস্থাপনা করেন সংগীতা চৌধুরী। এতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাংস্কৃতিক চর্চার সম্পর্ক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এবং দেশের সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন নাট্যকেন্দ্রের সদস্য ইকবাল বাবু। এ ছাড়া বক্তব্য দেন আশীষ খন্দকার, ঠাণ্ডু রায়হান, আলোক বসু, অধ্যাপক ইউসুফ হাসান অর্ক, অপূর্ব কুমার কুণ্ডু ও ড. ইসলাম শফিকসহ নাট্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে, সংস্কৃতির বিকাশ শুধু শিল্পচর্চার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সমাজের স্থিতিশীলতা, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই সাংস্কৃতিক ভীতি ও বিচ্ছিন্নতা দূর করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংস্কৃতির সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।