এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী রপ্তানি সুবিধা ধরে রাখা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্ব; কৃষি, পাট, জ্বালানি ও বন্দর খাতে সহযোগিতার আলোচনাইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এগিয়ে নেওয়া এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুবিধা ধরে রাখতে নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি কৃষি, পাটশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বন্দর অবকাঠামো ও পানি ব্যবস্থাপনায় ডাচ প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগ কাজে লাগিয়ে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমার (Sjoerd Sjoerdsma) সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয় তুলে ধরেন বাংলাদেশের বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।এফটিএ ও রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখার উদ্যোগবৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। প্রচলিত বাণিজ্যের বাইরে প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং টেকসই বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ইউরোপ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। এ বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ইইউর সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারিগরি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং শুল্কবহির্ভূত বাণিজ্য বাধা দূর করতে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রয়োজন।কৃষি ও পাটশিল্পে প্রযুক্তিগত সহযোগিতাকৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। উন্নত বীজপ্রযুক্তি, গবেষণা ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আলু ও অন্যান্য সবজির উৎপাদনশীলতা এবং গুণগত মান বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।সিলেটসহ দেশের সম্ভাবনাময় অঞ্চলে বিশেষায়িত সবজি চাষ সম্প্রসারণ, কৃষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহণ ও বাজারজাতকরণে আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়।পাটশিল্পের প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। উন্নত পাটবীজ উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, যৌথ গবেষণা এবং বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে ডাচ প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কাজে লাগানো যেতে পারে। পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ও মিশ্র তন্তুর কাপড় উৎপাদনের মাধ্যমে এ খাতে মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনাও রয়েছে।সার কারখানা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগবৈঠকে নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন। কৃষিপ্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিল্পের আধুনিকায়ন, সামুদ্রিক পরিবহণ ও পানি ব্যবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।বাংলাদেশের বিদ্যমান সার কারখানার আধুনিকায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ডাচ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান স্ট্যামিকার্বনের সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন দুই মন্ত্রী। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি বিনিময় ও জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি বৈঠকে উঠে আসে।বন্দর ও পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতাবন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামুদ্রিক পরিবহণ খাতে লালদিয়া টার্মিনালসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে ডাচ প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হয়। আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।পাশাপাশি নদী ও খাল খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডসের গবেষণা সংস্থা ডেল্টারেসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়।বিনিয়োগ পরিবেশ ও দক্ষতা উন্নয়নডাচ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে মেধাস্বত্ব ও পেটেন্ট সুরক্ষা, শুল্ক প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় দক্ষতা বৃদ্ধি, তরুণ ও নারী কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জোরিস ভ্যান বোমেলসহ দুই দেশের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।