অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের করা হত্যা মামলায় তুহিন, ফাহাদসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ফোনের কল থেকে মিলেছে অন্য আসামিদের সম্পৃক্ততার তথ্যতদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মোবাইল ফোনে আসা একাধিক কলের সূত্র ধরে অপর দুই কিশোরের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসে। পুলিশ বলছে, অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা ধার দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের তথ্যও পাওয়া গেছে। এ বিরোধ হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
কিশোর গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্যপ্রতিবেদকের অনুসন্ধানে অভিযুক্তদের সঙ্গে স্থানীয় ‘কোটবাড়ি বাইকার্স গ্রুপ’ নামের একটি কিশোর গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। ফাহাদ ও কামরুলকে ওই গোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয় সদস্য রাতুলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে দেখা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতেও রাতুলকে কোটবাড়ি এলাকায় শোডাউনে অংশ নিতে দেখা যায়।
তৃতীয় আসামি কামরুলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সময়ের পোস্ট থেকেও তার ওই কিশোর গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়া এবং পরে তার লাশ উদ্ধারের পর শোক প্রকাশ করে কামরুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চারটি পোস্টও দেয়।
তুহিনের বিরুদ্ধে আগের অভিযোগপ্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনের বিরুদ্ধে এর আগে বন্ধুর মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগী সোহাগের মা মরিয়ম আক্তার।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই রাতে কুমিল্লার সালমানপুরে অলি মিয়ার দোকানের সামনে থেকে সোহাগের মোটরসাইকেল নিয়ে যান তুহিন। পরে সেটি ফেরত না দেওয়ায় থানায় অভিযোগ করা হয়। অভিযোগপত্রে মোটরসাইকেলটির ক্রয়মূল্য ২ লাখ ৫ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়।
সোহাগের পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তুহিনের সুসম্পর্ক থাকায় এর আগেও বিভিন্ন ঘটনায় তিনি পার পেয়ে গেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিসিটিভিতে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনপ্রতিবেদকের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমকে হেঁটে যেতে দেখা গেছে। পরে তারা একটি অটোরিকশায় করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এসে নামেন।
ফাহাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা তথ্যঅভিযুক্ত ফাহাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ সেপ্টেম্বর তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ছবি পোস্ট করেন। ছবির সঙ্গে তিনি ‘১৯৮০ এর রাজত্ব’ লিখেছিলেন।
এর চার দিন পর, ১৫ সেপ্টেম্বর, ‘কোটবাড়ি বাইকার্স গ্রুপ জুনিয়র’-এর নেতৃস্থানীয় সদস্য রাতুলের জন্মদিন উদযাপনের একটি ছবি তার অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা হয়। ওই ছবিতে গোষ্ঠীটির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে ফাহাদকেও দেখা যায়।
অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন ফাহাদহত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল সরঞ্জামাদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করতেন। ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ১৪ হাজার টাকা মাসিক বেতনে তিনি কাজে যোগ দেন। তবে তার সঙ্গে তখনও কোনো চুক্তিপত্র হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অপ্রতিম ফাহাদকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। সম্প্রতি ওই টাকা ফেরত চাইলে এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, অপ্রতিম বেঁচে না থাকলে ওই টাকা ফেরত দিতে হবে না—এমন চিন্তাও ফাহাদের মধ্যে ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পরে তুহিনের সঙ্গে সে হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
প্রকৃত কারণ ও প্রত্যেকের ভূমিকা যাচাই করছে পুলিশঅপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে আসা এসব ব্যক্তি, ঘটনা ও পারস্পরিক যোগাযোগের যোগসূত্র কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনায় কারা জড়িত ছিল এবং প্রত্যেকের ভূমিকা কী—এসব বিষয় আরও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব তথ্যকে প্রাথমিক তদন্তের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক