শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর উদ্যোগ, সংসদে যাচ্ছে আইনের খসড়া

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০১ দুপুর
  • ৪০৪৩ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরির জন্য আইনের খসড়া প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের (এনপিএ) পরিচালনা পর্ষদ ইতোমধ্যে শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।

নতুন স্কিমে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ, তহবিল ব্যবস্থাপনা, মুনাফা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পৃথক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এ বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরা কাজ করছেন। একই সঙ্গে স্কিমটির আর্থিক স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি দায় নির্ধারণে অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণ করা হবে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার ইসলামিক বা শরিয়াহভিত্তিক সংস্করণ চালুর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আইনের খসড়া প্রণয়ন করে তা জাতীয় সংসদে পাঠানো হবে। স্কিমটির কাঠামো, পরিচালনপদ্ধতি, বিনিয়োগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য কারিগরি বিষয়ও নির্ধারণের কাজ চলছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

স্বামী-স্ত্রীর পেনশন সুবিধার বয়স বাড়ছে

বিদ্যমান সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায়ও কয়েকটি সুবিধা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোনো পেনশনার মারা গেলে তাঁর স্বামী বা স্ত্রী কিংবা নির্ধারিত সুবিধাভোগী এখন ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন সুবিধা পাবেন। আগে এই বয়সসীমা ছিল ৭৫ বছর। পেনশনার নিজে জীবদ্দশায় আজীবন পেনশন সুবিধা পাবেন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বজনীন পেনশন তহবিলের বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহকদের মুনাফার হারও বাড়ানো হয়েছে। ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এ হার ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন যেসব প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির কর্মীরা প্রচলিত সরকারি পেনশন সুবিধা পান না, তাদের ‘প্রগতি’ স্কিমের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং কী প্রক্রিয়ায় তা বাস্তবায়ন হবে, তা পরে নির্ধারণ করা হবে।

বিদেশগামী কর্মীদেরও ‘প্রবাস’ স্কিমে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের এ স্কিম সম্পর্কে অবহিত করা এবং নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

৫৫ বছর বয়সে পেনশন নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি

বর্তমানে সর্বজনীন পেনশনে পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর। এ বয়সসীমা কমিয়ে ৫৫ বছর করার বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

পেনশন তহবিল থেকে অংশগ্রহণকারীদের ঋণ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন নিশ্চিত করা এবং ঋণ দেওয়ার ফলে পেনশনভোগীদের স্বার্থ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

পেনশন কর্মসূচির সঙ্গে স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। কোন মডেলে এটি চালু করা সম্ভব এবং এতে পেনশন তহবিলের ওপর কী ধরনের আর্থিক প্রভাব পড়বে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে পেনশনের মুনাফা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

নিবন্ধনে প্রণোদনা বাড়ল

সর্বজনীন পেনশনে নতুন গ্রাহক বাড়াতে নিবন্ধন কার্যক্রমে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রণোদনা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রাহক নিবন্ধন করা হচ্ছে। আগে একজন নতুন গ্রাহক নিবন্ধনের জন্য ১৫ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হলেও তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারি নিরীক্ষার পাশাপাশি একটি বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে তহবিলের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে অতিরিক্ত নিরীক্ষা কাঠামো যুক্ত হবে।

চার স্কিমে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার গ্রাহক

দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হয়। বর্তমানে ‘প্রগতি’, ‘সুরক্ষা’, ‘সমতা’ ও ‘প্রবাস’—এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শুরু পর্যন্ত চারটি স্কিমে মোট নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার। তাঁদের জমা করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

এর মধ্যে ‘সমতা’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন। তাঁদের জমার পরিমাণ ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। আর প্রবাসীদের জন্য চালু করা ‘প্রবাস’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ১ হাজার ১৭১ জন। এ স্কিমে জমা হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

প্রত্যাশিত হারে অংশগ্রহণ না বাড়ার প্রেক্ষাপটে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতা সম্প্রসারণে নতুন এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালু, পেনশনারের মৃত্যুর পর স্বামী বা স্ত্রীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা বৃদ্ধি, বিনিয়োগের মুনাফা নির্ধারণ, সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অন্তর্ভুক্তি এবং নিবন্ধনে প্রণোদনা বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

তবে শরিয়াহভিত্তিক নতুন স্কিম চালু করতে আইনি কাঠামো প্রণয়ন, সংসদীয় প্রক্রিয়া, বিনিয়োগনীতি নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় অ্যাকচুয়ারিয়াল ও কারিগরি বিশ্লেষণ সম্পন্ন করতে হবে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই স্কিমটি চালুর পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারিত হবে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad