হাসপাতালটিতে অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ ১০টি। এর মধ্যে একটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। কর্মরত চিকিৎসকদের কয়েকজনকে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। ফলে বহির্বিভাগ, আন্তঃবিভাগ ও ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা চালাতে সীমিত জনবলে চাপ তৈরি হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অনুমোদিত ১০টি পদের মধ্যে একজন সিনিয়র কনসালট্যান্টের পদ শূন্য। বর্তমানে দুজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, একজন তত্ত্বাবধায়ক ও মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট, একজন কনসালট্যান্ট এবং ছয়জন মেডিকেল অফিসার দায়িত্ব পালন করছেন।
আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. শারিকুল ইসলাম বলেন, ছয়জন মেডিকেল অফিসারকে বহির্বিভাগের পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবার শিফটিং ডিউটিও করতে হয়। প্রতি আট ঘণ্টা পরপর চিকিৎসক পরিবর্তন করা হয়। কেউ ছুটিতে, ব্যক্তিগত কাজে বা প্রশিক্ষণে থাকলে চাপ আরও বেড়ে যায়। চিকিৎসকের পদ বাড়ানো হলে রোগীরা আরও ভালো সেবা পাবেন এবং চিকিৎসকদের ওপর চাপ কমবে।
পরীক্ষায় যন্ত্রপাতির সংকটচিকিৎসকের পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকটও রয়েছে হাসপাতালে। কয়েক মাস ধরে ল্যাবরেটরির অ্যানালাইজার মেশিনে সমস্যা থাকায় বিভিন্ন পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে আরবিএস, ইলেকট্রোলাইটসহ কিছু মৌলিক পরীক্ষা করা গেলেও বেশ কিছু পরীক্ষা হাসপাতালের বাইরে করাতে হচ্ছে রোগীদের।
ল্যাব সাপোর্ট স্টাফ গোলাম মওলা বলেন, অ্যানালাইজার মেশিনে সমস্যা থাকায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে অনেক পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রোগীদের বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে, এতে তাদের বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স সাবিনা ইয়াসমিন জানান, প্রতিদিন ভর্তি ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগীর পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় যন্ত্রপাতি কম থাকায় কোনো মেশিনে সমস্যা হলে সেবায় ব্যাঘাত ঘটে।
এক্স-রে ও ইসিজিতেও সীমাবদ্ধতাএক্স-রে বিভাগেও পুরোনো যন্ত্র নিয়ে ভোগান্তি রয়েছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) সাজ্জাদ আলী বলেন, দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর মেশিনটি একাধিকবার নষ্ট হয়েছে। মেরামতের পর আবারও সমস্যা দেখা দিয়েছে। মেরামতের জন্য ঢাকায় যোগাযোগ করা হচ্ছে।
তবে হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মোহা. মজিবুর রহমান বলেন, বর্তমানে এক্স-রে মেশিন সচল রয়েছে। ল্যাবরেটরির অ্যানালাইজার মেশিনটি মেরামতের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
হাসপাতালে ইসিজি মেশিনও রয়েছে মাত্র একটি। ফলে সেটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিকল্প ব্যবস্থা না থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
৪৮ ধরনের তালিকায় সরবরাহ ২০-২৫ওষুধ সরবরাহেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। হাসপাতালের তালিকায় প্রায় ৪৮ ধরনের ওষুধ থাকলেও নিয়মিতভাবে ২০ থেকে ২৫ ধরনের ওষুধ রোগীদের দেওয়া হচ্ছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। প্রয়োজনীয় অন্যান্য ওষুধ অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
ফার্মাসিস্ট শীলা রানী দত্ত বলেন, প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ রোগীকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।
টেকনোলজিস্টও প্রয়োজনের তুলনায় কমহাসপাতালের কারিগরি জনবলও অপ্রতুল। ল্যাবরেটরি ও এক্স-রে বিভাগে একজন করে টেকনোলজিস্ট রয়েছেন। এ ছাড়া তিনজন ফার্মাসিস্ট দায়িত্ব পালন করছেন।
সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মজিবুর রহমান বলেন, টেকনোলজিস্টের পদ আরও বাড়িয়ে পাঁচটি করা হলে সেবা পরিচালনা সহজ হবে।
৬০ বছরের পুরোনো ভবনেও সমস্যা১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটির অবকাঠামোতেও জীর্ণতার ছাপ রয়েছে। ৬০ বছরের পুরোনো ভবনের বিভিন্ন স্থানে দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। কয়েক দফা সংস্কারের পরও কিছু স্থানে একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। দরজা-জানালারও কোথাও কোথাও ভাঙাচোরা অবস্থা রয়েছে।
সুপারিনটেনডেন্ট জানান, ভবনের কয়েকটি ওয়ার্ডে পলেস্তারা খসে পড়ার সমস্যা দেখা দিলে গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে সংস্কার করা হয়েছে। নতুন করে যেখানে সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেগুলোও সংস্কারের জন্য জানানো হয়েছে। হাসপাতালের জন্য একটি নতুন মেডিকেল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিন ধরনের সেবাহাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমিত জনবল ও সরঞ্জামের মধ্যেও বহির্বিভাগ, আন্তঃবিভাগ ও ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা চালু রাখা হয়েছে। মূলত রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা এলেও রংপুর ও খুলনা বিভাগের কিছু এলাকা থেকেও রোগী আসেন।
হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মজিবুর রহমান বলেন, ১০ জন চিকিৎসক দিয়েই ইনডোর, আউটডোর ও জরুরি সেবা চালানো হচ্ছে।
তবে প্রতিদিনের বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপের বিপরীতে চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট, পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি ও ওষুধের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব ঘাটতি পূরণ করা না হলে হাসপাতালটির ওপর বাড়তে থাকা রোগীর চাপ সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক