পরিবার ও সমাজের নজরদারির ঘাটতি, অপরাধীচক্রের পৃষ্ঠপোষকতা এবং কিশোরদের অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদের অপরাধে ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশিং জোরদারে গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।
শহরে সক্রিয় অন্তত ১৫ গ্যাংগোয়েন্দা তথ্যের বরাতে জানা গেছে, বগুড়া শহরে অন্তত ১৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্যাংয়ের নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জন চিহ্নিত ব্যক্তি রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জলেশ্বরীতলা, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, পুরোনো শিল্পকলা একাডেমি, মহিলা ক্লাব, মুক্তির ফুলবাড়ী, সেউজগাড়ী রেল কলোনি বধ্যভূমি, সুবিল ব্রিজ, ফুলবাড়ী নদীর ঘাট, উপশহর, কলোনি, মালতীনগর স্টাফ কোয়ার্টার ও রহমাননগর এলাকায় এসব গ্যাংয়ের তৎপরতা বেশি।
পুলিশের তথ্যমতে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে বগুড়ায় ৫৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ৩৯টি হত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ২৩৯টির বেশি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাগত মে মাসে নিজ বাসার পার্কিং এলাকায় ছুরিকাঘাতে আহত হন ব্যবসায়ী ফারান তানভীর। এর আগে ১৭ এপ্রিল শাকপালা পার্কে সংঘর্ষের ঘটনায় স্কুলশিক্ষার্থী সামিউল সিয়াম নিহত হন।
২০২৫ সালে কালীতলা মোড়ে দায়িত্ব পালনকালে ফুলবাড়ী ফাঁড়ির এসআই আব্দুর রহমান ও এএসআই আহম্মদ আলীকে কুপিয়ে আহত করার ঘটনাতেও কিশোরদের সম্পৃক্ততার কথা উঠে আসে। এর আগে ২০২০ সালে জলেশ্বরীতলায় রশিদুল ইসলামকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায়ও কিশোররা জড়িত ছিল বলে জানা যায়।
অভিযান ও গ্রেপ্তারকিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ঠেকাতে বগুড়ায় নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার, গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের আগস্টে শাজাহানপুর উপজেলার শাবরুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘জালাল গ্রুপের’ ১১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে চাপাতি, বার্মিজ চাকু, বল্লম, ইয়াবা ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠের বয়স ছিল ১৪ বছর।
চলতি বছর বগুড়া শহরের নূরানী মোড় এলাকা থেকে ধারালো চাকুসহ আউলিয়া (১৯) ও রাহাত (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এর আগে ২০২৪ সালে গাবতলীর পীরগাছায় একটি পিকনিকের বাসে তল্লাশি চালিয়ে বার্মিজ চাকুসহ নয় কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২৫ সালের জুনে বগুড়া শহরের বৃন্দাবন ধুমারগড় এলাকা থেকে কিশোর গ্যাংয়ের নেতা ও ছিনতাইয়ে অভিযুক্ত সিফাতকে (১৯) গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি বড় ধারালো ছোরা উদ্ধার করা হয়।
পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথাবগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) রাইয়ান আলম বলেন, কিশোর অপরাধ দমনে দেশজুড়ে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে। গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের তালিকা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বগুড়াতেও এ কার্যক্রম জোরদার করা হবে এবং এ কাজে কমিউনিটি পুলিশের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের তথ্য শিক্ষা অফিসে পাঠানো হলে ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের শনাক্ত করা সহজ হবে। এর মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি ও ধারাবাহিক অভিযান চলছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।
গত ৫ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে কমিউনিটি পুলিশের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আতোয়ার রহমান বলেন, বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক