স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমানের ৯৮তম জন্মদিন আজ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৩ বিকাল
  • ৩২৪৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
বাংলা কবিতায় স্বাধীনতা, প্রতিবাদ, প্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার দীপ্ত উচ্চারণে যিনি স্বতন্ত্র আসন গড়ে নিয়েছেন, সেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ৯৮তম জন্মদিন আজ। ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দীর্ঘ ছয় দশকের সাহিত্যজীবনে তাঁর কবিতা বাঙালির ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।

কবিতায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, মানুষের অধিকার, প্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের প্রকাশ তাঁকে সমকালীন বাংলা সাহিত্যে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান এবং মৌলবাদ ও স্বৈরাচারবিরোধী লেখনীর কারণে তিনি ‘স্বাধীনতার কবি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। নাগরিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও সংবেদনশীলতার গভীর প্রকাশের জন্য তাঁকে বলা হয় ‘নাগরিক কবি’।

কবিতায় স্বাধীনতা ও প্রতিবাদের উচ্চারণ

শামসুর রাহমানের কবিতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাঙালির জাতীয় চেতনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘বর্ণমালা’ ও ‘আমার দুখিনী বর্ণমালা’ কবিতা পাঠকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, সামরিক শাসন, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল সোচ্চার। আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের সমালোচনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারাবাসের প্রেক্ষাপটে কবিতা রচনা এবং রবীন্দ্রসংগীতের ওপর পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ তাঁর সাহসী সাংস্কৃতিক অবস্থানের পরিচয় বহন করে।

১৯৮৭ সালে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি ধারাবাহিকভাবে ‘শৃঙ্খল মুক্তির কবিতা’, ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা’, ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা’ ও ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবিতা’ রচনা করেন। তাঁর কবিতা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মানুষের মধ্যে প্রতিবাদী চেতনা জাগিয়ে তুলেছে।

সাংবাদিকতা ও সাহিত্যজীবন

১৯৪৯ সালে ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকায় শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। একই বছর রেডিও পাকিস্তানে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬০ সালে আবার মর্নিং নিউজে ফিরে এসে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। পরে দৈনিক পাকিস্তানে সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর পত্রিকাটি দৈনিক বাংলা নামে প্রকাশিত হলে তিনি সেখানেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে সামরিক শাসনামলে দৈনিক বাংলা থেকে পদত্যাগের পর সাহিত্য পত্রিকা অধুনার সম্পাদনার দায়িত্ব নেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায়ও তিনি ছিলেন সমান সক্রিয়। সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লেখায় সিন্দাবাদ, চক্ষুষ্মান, লিপিকার, নেপথ্যে, জনান্তিকে ও মৈনাকসহ বিভিন্ন ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।

শতাধিক গ্রন্থ ও অসংখ্য স্বীকৃতি

১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। কবিতা ছাড়াও উপন্যাস, প্রবন্ধ ও শিশুতোষ সাহিত্য রচনা করেছেন তিনি। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক।

সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, জীবনানন্দ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার, নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক ও আনন্দ পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন। সাংবাদিকতার জন্য পান মিৎসুবিশি পুরস্কার। ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট. উপাধিতে ভূষিত করে।

মানুষের আন্দোলনে কবিতার প্রেরণা

শামসুর রাহমান ছিলেন মৃদুভাষী, কিন্তু অন্যায়, স্বৈরশাসন ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন। লেখনীর পাশাপাশি বিভিন্ন আন্দোলন ও অধিকার আদায়ের কর্মসূচিতেও তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কবিতা মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে জনমানসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছে।

২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এই কবি। তবে তাঁর সাহিত্যকর্ম, স্বাধীনতার পক্ষে উচ্চারিত কণ্ঠ এবং মানবিক মূল্যবোধ বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনে আজও প্রাসঙ্গিক।





কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad