সোনালি আঁশে ফিরছে সম্ভাবনা, কৃষকের দাবি ন্যায্যমূল্য

  • মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)
  • আপলোড সময় : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪০ দুপুর
  • ১৩৭৪৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবার পাটের ভালো ফলনে স্বস্তি ফিরেছে কৃষকের মনে। মে-জুনের তীব্র খরার পর জুলাই-আগস্টে টানা বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় ফলন প্রত্যাশা ছাড়িয়েছে। বাজারদরও গত কয়েক বছরের তুলনায় তুলনামূলক ভালো হওয়ায় লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার আশা করছেন চাষিরা। তবে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে পাট চাষে কৃষকের আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ। বছরে দেশে প্রায় ১৫ লাখ টন পাট উৎপাদিত হয়। বর্তমানে সাড়ে সাত থেকে আট লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হচ্ছে। উৎপাদিত প্রায় ৮০ লাখ বেলের মধ্যে ৫১ শতাংশ পাটকলে ব্যবহৃত হয়, ৪৪ শতাংশ কাঁচা অবস্থায় রপ্তানি হয় এবং মাত্র ৫ শতাংশ দেশের অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়।

সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রায় ৪০ লাখ কৃষক সরাসরি পাট চাষের সঙ্গে যুক্ত। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় চার কোটি। দেশের মধ্যে ফরিদপুর, যশোর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও জামালপুরে পাটের উৎপাদন তুলনামূলক বেশি।

রপ্তানি বাড়লেও কাঁচা পাটে ধস

টানা চার বছর কমার পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত তিন অর্থবছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। তবে রপ্তানিকারকদের মতে, বন্যায় আগের বছর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কাঁচা পাটের দাম বেড়ে যাওয়ায় অর্থের হিসাবে রপ্তানি বেড়েছে; পরিমাণের দিক থেকে তেমন বৃদ্ধি ঘটেনি।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিক জানান, গত অর্থবছরে প্রতি মণ কাঁচা পাট কিনতে হয়েছে ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকায়। আগের বছর এ দাম ছিল ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। তাঁর মতে, কাঁচামালের সরবরাহ স্বাভাবিক করা গেলে পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারে নেওয়া সম্ভব।

তথ্য অনুযায়ী, কাঁচা পাটের রপ্তানি ৭৭ শতাংশ কমে ৩৮ হাজার টনে নেমেছে। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার টন। তবে পাটের বস্তার রপ্তানি ৫ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ডলার এবং পাটের সুতার রপ্তানি ১৮ শতাংশ বেড়ে ৪৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রয়াদেশ কমায় বহুমুখী পাটপণ্যের রপ্তানি ১১ শতাংশ কমে ৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলারে নেমেছে।

রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল করিম বলেন, বহুমুখী পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া রপ্তানি বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এ জন্য গবেষণা ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

উৎপাদন খরচ নিয়ে কৃষকের উদ্বেগ

বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও দাম আরও কম। স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, আবহাওয়ার কারণে কিছু এলাকায় ফলন কমেছে। পাশাপাশি মিল মালিকদের চাহিদা কম থাকায় কোনো কোনো বাজারে দামও কমেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন, উৎপাদন খরচ বাড়লেও তাঁরা প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না। তাঁদের দাবি, মৌসুমের শুরুতেই সরকার পাটের একটি ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করলে কৃষক উপকৃত হবেন।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে এবার পাটের বাম্পার ফলন ও তুলনামূলক ভালো দামে কৃষকের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও শ্রমিক সংকট ও বাড়তি উৎপাদন খরচ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কৃষক কালাম গায়ান জানান, শ্রমিকের দৈনিক মজুরি এখন ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। এতে প্রতি বিঘায় খরচ দাঁড়াচ্ছে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা। অথচ মণপ্রতি ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা দরে পাট বিক্রি করে বিঘাপ্রতি আয় হচ্ছে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা। তাঁর দাবি, সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট কিনলে বাজারদর বাড়বে।

বাংলাদেশ পাটচাষি সমিতির সভাপতি মোক্তার মোল্যা বলেন, উৎপাদন খরচ না ওঠায় কৃষকেরা লোকসানে রয়েছেন। শ্রমিক ও কৃষি উপকরণের মূল্য বিবেচনায় নিয়ে প্রতি মণ পাটের দাম ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং সরকারি উদ্যোগে পাট কেনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে কৃষকেরা পাট চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন বলেও তিনি জানান।

ফরিদপুর ও রাজশাহীতে ভালো ফলন

পাটের রাজধানীখ্যাত ফরিদপুরে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৮৭ হাজার ৪০২ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। ‘সোনালি আঁশে ভরপুর, ভালোবাসি ফরিদপুর’ স্লোগানে জেলার সালথা ও নগরকান্দায় সবচেয়ে বেশি পাট চাষ হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত পানি, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।

রাজশাহীর ৯ উপজেলায় এবার ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে ৮২ শতাংশ জমির পাট কাটা হয়েছে এবং উৎপাদন হয়েছে ৪৮ হাজার ২০০ টন। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে মণপ্রতি ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকা দরে পাট বিক্রি হচ্ছে। এতে জেলায় প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকা আয় হতে পারে।

নড়াইলে এবার ২৩ হাজার ৫১৭ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় সামান্য বেশি। সেখানে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৮৯৮ বেল পাট উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সরকারি প্রণোদনার আওতায় ৩ হাজার ২০০ প্রান্তিক কৃষক বিনামূল্যে বীজ ও সার পেয়েছেন।

চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের পরিকল্পনা

বাণিজ্য, শিল্প এবং পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো গেলে পাটের দাম বাড়বে এবং কৃষকেরাও পাট চাষে উৎসাহিত হবেন। তিনি চীনে পাট রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা এবং দুই দেশের সহযোগিতায় টেক্সটাইল খাতের রপ্তানি দ্বিগুণ করার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন।

পরিবেশ সুরক্ষায় পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাড়াতে সরকারের উদ্যোগ অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের চাহিদা ধরে রাখতে সহায়ক হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা।

সাবেক কৃষি সচিব ড. এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের মতে, পাটের সম্ভাবনা কখনো ফুরাবে না। সীমিত জমিতেও উৎপাদন আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) মহাপরিচালক ড. নার্গিস আক্তার জানান, প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৫৭টি জাত, ২২৩টি কৃষি প্রযুক্তি এবং ৬৯টি শিল্প-কারিগরি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। পাটপণ্য রপ্তানিকারকেরা ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনাও পাচ্ছেন।

সব মিলিয়ে এবারের মৌসুমে ভালো ফলন পাটচাষিদের স্বস্তি দিলেও উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বহুমুখী পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো, নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি এবং কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সোনালি আঁশের রপ্তানি সম্ভাবনা আরও কাজে লাগানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad