৭৯ বছরেও মীমাংসা হয়নি মুহুরীর চরের সীমান্ত বিরোধ

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২১ দুপুর
  • ৩৫৭২ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
ফেনীর পরশুরামের বিলোনিয়া সীমান্তে মুহুরী নদীর চরে জমির দখল ও মালিকানা নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের বিরোধ ৭৯ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি। কাগজপত্রে জমির মালিকানা বাংলাদেশের নাগরিকদের নামে থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তারা এসব জমিতে যেতে ও চাষাবাদ করতে পারছেন না। সীমান্ত নির্ধারণে দুই দেশের যৌথ জরিপ, একাধিক বৈঠক এবং ৪৪টি অস্থায়ী কাঠের খুঁটি স্থাপন করা হলেও স্থায়ীভাবে সীমারেখা চিহ্নিত করার উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির সময় থেকে মুহুরী নদীর প্রায় দুই কিলোমিটার সীমান্ত নিয়ে এ বিরোধের সূত্রপাত। পরে ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব স্থলসীমান্ত চুক্তি, ২০১১ সালের প্রটোকল এবং ২০১০-১১ ও ২০১৩-১৪ সালের যৌথ জরিপের মাধ্যমে বিরোধ নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৪ সালে যৌথ জরিপের পর ৪৪টি কাঠের খুঁটি বসিয়ে সীমারেখা পুনর্নির্ধারণ করা হলেও সেগুলোর স্থলে স্থায়ী পিলার নির্মাণের বিষয়টি আর এগোয়নি।

জমির পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন তথ্য

সরকারি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ত্রিপুরা সীমান্তের ৮৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে পরশুরামের মুহুরী নদী এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার সীমান্ত অমীমাংসিত ছিল। বিভিন্ন সরকারি নথিতে মুহুরীর চরের আয়তন ৯২ দশমিক ১৪ একর উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১১ সালের প্রটোকল-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এর মধ্যে বাংলাদেশ পাবে ৭১ দশমিক ৯৪ একর এবং ভারত পাবে ২০ দশমিক ২০ একর।

২০১৪ সালের ১৫ থেকে ১৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও ভারতের জরিপ বিভাগ বিজিবি ও বিএসএফের সহযোগিতায় এলাকায় যৌথ জরিপ চালায়। তবে স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, ৯২ দশমিক ১৪ একরের মধ্যে প্রায় ৩১ দশমিক ১৮ একর বাংলাদেশের দখলে, ৮ একর ভারতের দখলে এবং অবশিষ্ট ৫২ দশমিক ৯৬ একর ভূমি এখনো অমীমাংসিত।

নদীর গতিপথ বদলেই জটিলতা

মুহুরীর চর কোনো পরিকল্পিত ভূখণ্ড নয়। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভাঙন ও পলি জমার মাধ্যমে এর বর্তমান ভূপ্রকৃতি তৈরি হয়েছে। ১৯৪৭ সালের রেডক্লিফ লাইনে মুহুরী নদীর মধ্যস্রোতকে সীমান্তের ভিত্তি ধরা হয়েছিল। পরে আশির দশকে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে পশ্চিম দিকে সরে যায়। পুরোনো নদীপথ শুকিয়ে নতুন চর জেগে ওঠায় সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

নদীর মধ্যস্রোতকে সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত নির্ধারণের বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই দেশের ভূখণ্ডের সীমানা নিয়ে বিরোধটি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

৪৪ কাঠের খুঁটিও নষ্ট

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ মৌসুমে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যৌথ অনুরোধে অমীমাংসিত মুহুরী চর এলাকায় মাঠ জরিপ চালানো হয়। জরিপ শেষে ৪৪টি কাঠের খুঁটি স্থাপন করে সীমারেখা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। দুই দেশের সরকারের সম্মতি পেলে সেখানে স্থায়ী পিলার নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল।

তবে সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি। সীমান্তে বসানো কাঠের খুঁটিগুলোর অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। জরিপ নম্বরযুক্ত লোহার পাতও মরিচা ধরে বিবর্ণ হয়ে গেছে। ফলে স্থায়ী কংক্রিট পিলার না থাকায় সীমারেখার দৃশ্যমানতা ও মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে।

জমি থাকলেও যেতে পারেন না কৃষক

উত্তর কাউতলী গ্রামের ফকির নুর মোস্তফার পরিবারের প্রায় ১০ একর জমি রয়েছে মুহুরীর চরে। বিএসএফের বাধার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তারা এসব জমিতে যেতে পারছেন না।

নুর মোস্তফা বলেন, ‘আমাদের ভাইদের বেশিরভাগ জমি মুহুরীর চরের মধ্যে। ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে এসব জমিতে চাষাবাদ করতে পারছি না।’

স্থানীয় বাসিন্দা দাউদুল ইসলাম ফকির বলেন, সিএস ও বিএস খতিয়ান থাকার পরও জমির মালিক হয়েও তারা সেখানে যেতে পারছেন না। তাঁর অভিযোগ, ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে তারা জমির দখলে যেতে পারছেন না।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সহকারী জরিপ কর্মকর্তা পারভেজ মিয়া জানান, বিরোধপূর্ণ মুহুরীর চরের সীমানা বিরোধ নিরসনে ২০১৬ সালে দুই দেশের জেপিডব্লিউডির যৌথ উদ্যোগে মাঠপর্যায়ে সীমানা নির্ধারণ, জরিপ ও সীমান্ত চিহ্ন স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়। বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে জরিপ প্রতিবেদন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ফেনী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এমএম জিল্লুর রহমান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান কৃষকরা

১৭ সেপ্টেম্বর ফেনীর পরশুরামে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে মুহুরীর চরের জমির মালিকরা নতুন করে আশাবাদী হয়েছেন। সম্প্রতি একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে মুহুরী-কহুয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান তারা।

স্থানীয়দের দাবি, বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি পরশুরাম-সুবার বাজার সড়কে মুহুরী সেতু নির্মাণ এবং বাংলাদেশি কৃষকদের জমি উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলে এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে।

মির্জানগর ইউনিয়নের নিজ কালিকাপুর, উত্তর কাউতলী ও ফকিরের খিল গ্রামের শতাধিক কৃষকের জমি রয়েছে মুহুরীর চরে। তাঁদের অভিযোগ, বিএসএফের বাধার কারণে বছরের পর বছর নিজেদের জমিতে যাওয়া ও চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না।

নিজ কালিকাপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আলমগীর মজুমদার বলেন, মুহুরীর চরে শতাধিক বাংলাদেশি কৃষকের জমি রয়েছে। একসময় সেখানে অনেকের ভিটেমাটিও ছিল। এখন সেগুলো ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ১৯৪৭ সাল থেকে চরের জমি নিয়ে বিরোধের অবসান হয়নি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশি কৃষকদের জমি উদ্ধার করে চাষাবাদের আওতায় আনা গেলে তাঁরা নতুন করে জীবন ফিরে পাবেন এবং তাঁদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হবে। প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগ নিয়ে বিষয়টির সমাধান করলে কৃষকেরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।

তথ্যসূত্র: দৈনিক আমার দেশ, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad