মাদকের ছোবলে কিশোর সমাজ—নীতিনির্ধারকদের এখনই জবাব দিতে হবে

  • মোঃ জাকির হোসাইন,সম্পাদক
  • আপলোড সময় : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৩ দুপুর
  • ৭৯০৩ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

মাদকের ছোবলে কিশোর সমাজ—নীতিনির্ধারকদের এখনই জবাব দিতে হবে

একটি জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার জন্য সবসময় বড় কোনো যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি প্রজন্মের হাতে মাদক তুলে দেওয়াই যথেষ্ট। উদ্বেগের বিষয় হলো—মাদকের বিস্তার ও কিশোর অপরাধ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সামাজিক ঘটনা নয়; এটি পরিবার, শিক্ষা, জননিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ।

কিশোর বয়স মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি। এই বয়সেই চরিত্র, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যতের পথ তৈরি হয়। অথচ এই সময়েই কোনো কিশোর মাদকের সংস্পর্শে এলে কিংবা অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে তার ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না—তার অভিঘাত পড়ে পরিবার ও সমাজের ওপরও।

প্রশ্ন হলো, কিশোররা কেন বিপথে যাচ্ছে?

এর কোনো একক উত্তর নেই। পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি, সঙ্গদোষ, মাদকের প্রাপ্যতা, হতাশা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত তদারকির অভাব, সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগের সংকট এবং অপরাধী চক্রের প্রলোভন—বিভিন্ন কারণ মিলেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে।

তবে সমস্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হলো মাদকের সরবরাহব্যবস্থা। কিশোরদের কাছে মাদক পৌঁছায় কীভাবে—এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে কেবল কিশোরদের দায়ী করলে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়ালেই থেকে যাবে।

যে ব্যক্তি বা চক্র মাদক সরবরাহ করছে, কিশোরদের ব্যবহার করছে কিংবা তাদের অপরাধে জড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পরিচয়, প্রভাব বা ক্ষমতার কোনো বিবেচনা থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত কিশোরদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে।

পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব

সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কীভাবে সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। তবে শুধু শাসন নয়, সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাও জরুরি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, সৃজনশীল কার্যক্রম ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে। একজন কিশোরের সামনে ইতিবাচক বিকল্প যত বেশি থাকবে, অপরাধী চক্রের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তত কমবে।

নীতিনির্ধারকদের প্রতি স্পষ্ট দাবি

এই সংকট মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। আমরা মনে করি, নীতিনির্ধারকদের সামনে কয়েকটি বিষয়ে অবিলম্বে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা দরকার—

প্রথমত, মাদক সরবরাহের উৎস, পরিবহনপথ ও স্থানীয় নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে নিয়মিত ও সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কিশোরদের মাদক ও অপরাধে ব্যবহারকারী চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কিশোরদের জন্য মাদকবিরোধী সচেতনতা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শক্তিশালী করতে হবে।

চতুর্থত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম, কাউন্সেলিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তা ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

পঞ্চমত, কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও যুব কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।

ষষ্ঠত, কিশোর অপরাধের প্রকৃত কারণ, প্রবণতা ও এলাকাভিত্তিক ঝুঁকি চিহ্নিত করতে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণার ব্যবস্থা করতে হবে।

সপ্তমত, মাদকবিরোধী কার্যক্রমের সাফল্য শুধু অভিযানের সংখ্যা দিয়ে নয়—মাদক সরবরাহ কমেছে কি না, কিশোরদের ঝুঁকি কমেছে কি না এবং আসক্তরা পুনর্বাসিত হচ্ছে কি না—এসব সূচকে মূল্যায়ন করতে হবে।

অষ্টমত, মাদকবিরোধী আইন প্রয়োগে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অভিযান কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক উদ্যোগে পরিণত না হয়।

এখনই সিদ্ধান্তের সময়

আজ যে কিশোরটি মাদকের শিকার, আগামীকাল সে একটি পরিবার, একটি সমাজ ও একটি দেশের সম্পদ হতে পারত। তাকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়; হারানো একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।

কাজেই মাদক ও কিশোর অপরাধকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখার সময় শেষ। এটি এখন সামাজিক, শিক্ষাগত ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বহুমাত্রিক সংকট। এর মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে।

নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের প্রশ্ন একটাই—আর কত কিশোর বিপথে গেলে আমরা এটিকে জাতীয় উদ্বেগ হিসেবে দেখব?

সমাধানের জন্য এখন আর শুধু আশ্বাস নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান কর্মপরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহি।

কিশোরদের হাতে মাদক নয়, ভবিষ্যৎ তুলে দিতে হবে। অপরাধের অন্ধকার নয়, তাদের সামনে খুলে দিতে হবে সম্ভাবনার দরজা। আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের সমাজ কেমন হবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad