এ অবস্থায় বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমাতে চট্টগ্রাম অংশের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার রেলপথ আরও পাঁচ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তবে কোন কোন অংশ মিলিয়ে এই ৪৭ কিলোমিটার উঁচু করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
জুলাইয়ে পাঁচ দিন বন্ধ ছিল ট্রেন২০২৬ সালের জুলাইয়ে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর-জানআলীহাট অংশের শমসের পাড়ায় প্রায় ৫০০ মিটার রেলপথ পানিতে তলিয়ে যায়। জানআলীহাট স্টেশনের প্রায় এক কিলোমিটার পূর্বের ওই এলাকায় রেললাইনের ওপর পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ২১ ইঞ্চি ছিল। পানির স্রোতে রেললাইনের কিছু ব্যালাস্টও সরে যায়।
পানি ওঠার পর কয়েক ঘণ্টা আটকে থাকার একপর্যায়ে পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন ফিরিয়ে নিতে হয়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের একাধিক ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়। পাঁচ দিন পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের সময় প্রায় ৩০০ মিটার রেলপথ স্থানভেদে সর্বোচ্চ দেড় ফুট পর্যন্ত উঁচু করা হয়।
আগেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রেলপথএর আগে ২০২৩ সালে নির্মাণাধীন দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের সাতকানিয়ার তেমুহুনি এলাকায় বন্যায় প্রায় ৪৫০ মিটার রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে সময় প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান জানিয়েছিলেন, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় গত ১০০ বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন রেললাইনটি প্রায় ২০ ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছিল।
ওই ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ অভিযোগ করেন, রেললাইনের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে প্রকল্প পরিচালক অভিযোগটি নাকচ করে বলেছিলেন, সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়া রেললাইনের কারণে বন্যা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়। প্রকল্পের বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট, ব্রিজ ও বক্স কালভার্ট রাখা হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
তবে এবারের জলাবদ্ধতার ঘটনা নতুন দোহাজারী-কক্সবাজার অংশে নয়। পানি উঠেছে মূলত নগরের ষোলশহর-দোহাজারী অংশের পুরোনো রেলপথে। এই অংশেরই প্রয়োজনীয় স্থানগুলো উঁচু করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
১৫০ বছরের পরিকল্পনার কথা বলছে রেলওয়েজুলাইয়ের জলাবদ্ধতার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানান, চট্টগ্রামের ৪৭ কিলোমিটার রেলপথ পাঁচ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে পানির উচ্চতা তিন ফুট পর্যন্ত বাড়লেও যাতে ট্রেন চলাচলে সমস্যা না হয়, সে লক্ষ্যেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে রেলপথ নির্মাণে কোনো ত্রুটি হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে কোন ৪৭ কিলোমিটার অংশ উঁচু করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি রেলওয়ে।
প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক আসাদুল হক জানান, প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণার পর ৪৭ কিলোমিটার রেলপথ উঁচু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী মাসে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে। তাদের জরিপের পর কোন কোন অংশ নিয়ে ৪৭ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হবে, তা চূড়ান্ত হবে।
১০০ বছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী রেললাইন নির্মাণের পরও কেন পানি উঠছে—এ প্রশ্নের জবাবে আসাদুল হক বলেন, বাংলাদেশে পরিবেশ ও ঋতুর পরিবর্তন হচ্ছে। রেললাইন ১০০ বছরের পরিকল্পনা করেই নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন পানি ওঠার পরিস্থিতি বিবেচনায় ১৫০ বছরের পরিকল্পনা করে রেলপথ উঁচু করা হবে।
খাল-ছড়া ও পানিপ্রবাহও যাচাই হবেরেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, কোথায় রেললাইন তুলনামূলক নিচু এবং কোথায় পানি নিষ্কাশনের সমস্যা বেশি, তা নির্ধারণে রেলওয়ের প্রকল্পের নকশা, লংগিচ্যুডিনাল সেকশন, ফিনিশড গ্রাউন্ড লেভেল এবং বন্যার পানির সর্বোচ্চ উচ্চতার তথ্য পাশাপাশি পর্যালোচনা করা হবে।
দোহাজারী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত কোন কোন খাল, ছড়া ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ রেললাইনের নিচ দিয়ে গেছে, তার তালিকাও করা হবে। প্রতিটি কালভার্টের আকার ও অবস্থান নকশার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি বর্ষায় পাহাড়ি ঢল কোন দিক থেকে আসে এবং কোথায় গিয়ে পানি আটকে যায়, তা মাঠপর্যায়ে পর্যালোচনা করা হবে।
বিশেষ করে সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, দোহাজারী এবং নগরের ষোলশহর-জানআলীহাট অংশকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাইয়ের বৃষ্টিতে শুধু রেললাইনের ওপর পানি জমেনি, পানির স্রোতে লাইনের নিচের ব্যালাস্টও সরে গেছে। পরে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করা হয়। ফলে সমস্যা শুধু রেললাইনের ওপর পানি ওঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পানির প্রবাহ রেললাইনের নিচের কাঠামোর ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি করছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক