সার ডিলার নিয়োগে সচিবালয়ে তদবিরের ভিড়, আবেদন ৪৬ হাজার ৯৫৫

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ দুপুর
  • ৪৯৫০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে তদবিরকারীদের আনাগোনা বেড়েছে। সংসদ সদস্য, বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, জনপ্রতিনিধি ও তাদের অনুসারীরা পছন্দের ব্যক্তিকে ডিলার নিয়োগ দিতে মন্ত্রী ও সচিবের দপ্তরে যোগাযোগ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর নতুন সার ডিলার নিয়োগের আবেদনের সময়সীমা শেষ হয়। এরপর থেকেই সচিবালয়ে তদবিরের তৎপরতা বাড়তে থাকে। গত রোববার ও সোমবার কৃষিমন্ত্রীর দপ্তরের সামনে বিপুলসংখ্যক মানুষকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। মঙ্গলবার মন্ত্রী ঢাকার বাইরে থাকায় তদবিরকারীদের একটি অংশ কৃষি সচিবের দপ্তরের সামনে জড়ো হন।

৪৯৩১ ডিলারের বিপরীতে আবেদন ৪৬ হাজার ৯৫৫

কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সূত্র জানায়, সারা দেশে ৪ হাজার ৯৩১টি নতুন সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ৪৬ হাজার ৯৫৫টি আবেদন জমা পড়েছে। অর্থাৎ প্রতি ডিলারশিপের বিপরীতে গড়ে প্রায় ১০টি আবেদন রয়েছে।

মঙ্গলবার কৃষি মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সচিবের দপ্তরের আশপাশে সকাল থেকেই লোকজনের জটলা দেখা যায়। অনেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের বড় অংশই সার ডিলার নিয়োগের বিষয়ে কথা বলতে এসেছেন বলে জানা যায়।

এদিন নাটোরের লালপুরের সংরক্ষিত আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সানজিদা ইয়াসমিন তুলি দলবল নিয়ে কৃষি সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সচিবের দপ্তর থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তি জানান, নিজ এলাকার সার ডিলার নিয়োগের বিষয়েই তারা কথা বলতে এসেছিলেন।

এর কিছুক্ষণ পর বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমানও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সচিবের দপ্তর থেকে বের হন। তাঁরও আসার কারণ ছিল সার ডিলারশিপের তদবির।

রংপুর সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানা জানান, তাঁর স্ত্রীর নামে সার ডিলারশিপের জন্য আবেদন করা হয়েছে। ওই আবেদন নিয়ে সচিবের সঙ্গে কথা বলতেই তিনি মন্ত্রণালয়ে এসেছেন।

ভোলা সদর উপজেলার ভোলা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কবীর মৃধাও সার ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছেন। বর্তমানে সার বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবসা করা এই ব্যক্তি জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ‘মেসার্স কবীর মৃধা’। সচিবের দপ্তরের আশপাশে অবস্থান করলেও সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

রাজনৈতিক তদবিরের অভিযোগ

কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, গত রোববার থেকে চলতি সপ্তাহে অর্ধশতাধিক সংসদ সদস্য কৃষিমন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের বড় অংশের আলোচনার বিষয় ছিল নিজ নিজ এলাকার পছন্দের ব্যক্তিকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া।

মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন সংসদ সদস্য তাঁর এলাকার একটি ইউনিয়নের ডিলার নিয়োগের জন্য তিনজনের নাম সুপারিশ করে পাঠিয়েছেন। পরে তালিকায় প্রথমে থাকা প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগের জন্য ওই সংসদ সদস্য তদবির করেছেন বলেও তিনি জানান।

৩০-৫০ লাখ টাকা চুক্তির অভিযোগ

ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তদবিরের পাশাপাশি অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তির অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য সার ডিলার হিসেবে কয়েকজনের নাম স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা প্রকাশ করেনি। ফলে আলোচনায় থাকা তালিকাটি চূড়ান্ত কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পীরগাছার কান্দি ইউনিয়নের সম্ভাব্য ডিলার আতাউর রহমানকে ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে ২৭ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি অডিওতে অন্নদানগর ইউনিয়নের কীটনাশক ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন ও সার-কীটনাশক ব্যবসায়ী আবদুর রহিমের কথোপকথন শোনা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁরা দুজনই ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেও তালিকায় স্থান না পাওয়ায় আক্ষেপ করেছেন বলে অডিওটির বিষয়ে প্রচার করা হয়েছে। অভিযোগটিরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

যেভাবে হবে ডিলার নিয়োগ

গত ২৭ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় নতুন সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা প্রকাশ করে। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রথমে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করবে। এরপর দুই কার্যদিবসের মধ্যে আবেদনপত্র উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠানো হবে।

উপজেলা কমিটি আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই করে বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবে। জেলা কমিটি পুনরায় এসব তথ্য যাচাই করে প্রতি ইউনিয়নের তিনজন প্রার্থীর তালিকা সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠাবে।

কেন্দ্রীয় কমিটি আবেদনপত্র ও প্রার্থীদের তথ্য পরীক্ষা করে ইউনিয়নপ্রতি একজনকে মনোনয়ন দেবে। এরপর সাত কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত ডিলার নিয়োগ অনুমোদনের বিধান রয়েছে। অনুমোদনের পর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করবে।

উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। ফলে আবেদন যাচাই-বাছাই ও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।

‘যোগ্য আবেদনকারীই নির্বাচিত হবে’

কৃষি সচিব সেলিম খান আমার দেশ-কে বলেন, ডিলারশিপের আবেদনগুলো উপজেলা ও জেলার মাধ্যমে এসেছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত মানদণ্ডের আলোকে বর্তমানে আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। বিভাগ ও জেলা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা আবেদনগুলো যাচাই করছেন। চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।

লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার নামে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি।

সচিব বলেন, নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। সবচেয়ে যোগ্য আবেদনকারীকে নির্বাচিত করা হবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad