অযত্নে হারিয়ে যাচ্ছে কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতিচিহ্ন

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১০ দুপুর
  • ৫২২৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতিচিহ্ন
বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলো দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে পড়ে আছে। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনায় ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘কবি শেখ ফজলল করিম স্মৃতি গণপাঠাগার’ প্রায় দুই দশক ধরে বন্ধ। অন্যদিকে কবির জন্মভিটায় থাকা তাঁর ব্যবহৃত দুর্লভ সামগ্রীও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পাঠাগারটি দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। ফলে শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকদের জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

অযত্নে পাঠাগার, চারপাশে ময়লার স্তূপ

সরেজমিন দেখা যায়, পাঠাগারের প্রধান ফটকের দুপাশে দোকান বসানো হয়েছে। আশপাশে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। ভবনের দেয়ালের রং উঠে গেছে এবং ঝুলন্ত সাইনবোর্ডটিও মলিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পাঠাগারটি এখন শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকদের ব্যবহারের বাইরে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে মাঝেমধ্যে অনুষ্ঠান হলেও সারা বছর পাঠাগার পরিচালনা ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে নিয়মিত কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।

বাড়িতে অরক্ষিত কবির স্মৃতিচিহ্ন

কাকিনায় কবির জন্মভিটায় গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠানের এক পাশে রয়েছে তাঁর কবর। টিনশেডের আধাপাকা বাড়ির একটি কক্ষে সংরক্ষণ করা হয়েছে কবির ব্যবহৃত কাঠের খাট, আরামচেয়ার, টুপি, দোয়াত-কলম, ছোট আকৃতির কোরআন শরিফ, ম্যাগনিফায়িং গ্লাস, বোতামসহ বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন।

পরিবারের সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগে এসব সামগ্রী সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন। তবে লোকবল ও অর্থের সংকটের কারণে দীর্ঘমেয়াদে এগুলো সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে সাহিত্যানুরাগীরা কবির বাড়িতে এলেও তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা কিংবা নিয়মিত প্রদর্শনীর সুযোগ নেই।

কবির নাতির ছেলে শেখ ফিরোজ বলেন, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত থেকে অনেক মানুষ কবির স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে আসেন। কিন্তু লোকবল ও অর্থের সংকটে পরিবারের পক্ষে এসব স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি সরকারি উদ্যোগে একটি জাদুঘর নির্মাণ করে কবির ব্যবহৃত সামগ্রী সংরক্ষণের দাবি জানান। একই সঙ্গে একসময় পাঠ্যপুস্তকে থাকা কবিতা ‘কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক’ পুনরায় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

দ্রুত সংরক্ষণের দাবি স্থানীয়দের

কাকিনার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী কবির হোসেন বলেন, একজন গুরুত্বপূর্ণ কবির স্মৃতি এভাবে নষ্ট হতে দেখা কষ্টকর। দ্রুত পাঠাগারটি চালু এবং কবির স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

কলেজ শিক্ষার্থী মাহমুদা আক্তার বলেন, তাঁদের বাড়ির কাছেই একজন গুরুত্বপূর্ণ কবির জন্মভিটা হলেও অনেকেই তাঁর সম্পর্কে জানেন না। তিনি কখনো পাঠাগারটি খোলা দেখেননি। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কবি শেখ ফজলল করিম সম্পর্কে জানার সুযোগ হারাবে।

ঢাকা, বগুড়া ও কুমিল্লা থেকে আসা কয়েকজন দর্শনার্থীও কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানের অযত্নের চিত্রে হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে কবির ব্যবহৃত সামগ্রী যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব।

দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রশাসনের

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পাঠাগারটি দ্রুত চালুর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কবির ব্যবহৃত দুর্লভ স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হবে।

সাহিত্যকর্মে সমৃদ্ধ অবদান

১৮৮২ সালের ১৪ এপ্রিল লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ ফজলল করিম। কাকিনা স্কুল ও রংপুর জেলা স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হলেও তা দীর্ঘায়িত হয়নি। অল্প বয়সেই সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন তিনি।

গদ্য ও পদ্য মিলিয়ে তাঁর প্রায় ৪৫টি গ্রন্থ রয়েছে। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘সাহিত্য বিশারদ’, ‘নীতিভূষণ’ ও ‘কাব্যরত্নাকর’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৩৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই কবির জন্মভিটা, পাঠাগার ও ব্যবহৃত সামগ্রী যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে তা নতুন প্রজন্মের সাহিত্যচর্চা ও ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad