হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ নেয় তা পরিশোধ করার নিয়তে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করে দেন। আর যে ব্যক্তি তা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৮৭)
অর্থাৎ ঋণ নেওয়ার সময় থেকেই তা পরিশোধের দৃঢ় নিয়ত থাকতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে পাওনাদারকে এড়িয়ে যাওয়া, যোগাযোগ বন্ধ রাখা কিংবা তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা না করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রথমে খুঁজতে হবে পাওনাদারকেপাওনাদারের সন্ধান না পাওয়া গেলে প্রথম দায়িত্ব হলো তাকে খুঁজে বের করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা। তার সর্বশেষ জানা ঠিকানা, আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন ও অন্যান্য সম্ভাব্য মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হবে।
পাওনাদার মারা গিয়ে থাকলে তাঁর ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীদের সন্ধান করতে হবে। দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও তাদের কোনো সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত ঋণের অর্থ নিজের কাছে রেখে দেওয়াকে দায়মুক্তির উপায় হিসেবে দেখা যাবে না।
পাওনাদারকে না পেলে সদকাসব ধরনের যুক্তিসংগত চেষ্টা করেও পাওনাদার বা তাঁর ওয়ারিশদের সন্ধান পাওয়া না গেলে ফিকহি ব্যাখ্যা অনুযায়ী ওই অর্থ তাঁদের পক্ষ থেকে সদকা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিয়ত থাকবে—পাওনা অর্থের মালিকের পক্ষ থেকে তা দান করা হচ্ছে।
অর্থটি গরিব-দুঃখী বা বৈধ জনকল্যাণমূলক কাজে দেওয়া যেতে পারে। ফিকহের আলোচনায় এমন অর্থ নিজের দরিদ্র আত্মীয়স্বজনকে দেওয়ারও অবকাশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিষয়টি নিজের ইচ্ছামতো ঋণ মওকুফ ধরে নেওয়া নয়; বরং প্রকৃত মালিকের পক্ষ থেকে তার সম্পদ ব্যয় করার একটি ব্যবস্থা।
পরে পাওনাদারের সন্ধান পেলেপাওনাদারের পক্ষ থেকে অর্থ সদকা করার পর ভবিষ্যতে তিনি বা তাঁর বৈধ ওয়ারিশের সন্ধান পাওয়া গেলে বিষয়টি তাঁদের জানাতে হবে। তাঁরা যদি ওই সদকাকে গ্রহণ না করে নিজেদের পাওনা দাবি করেন, তাহলে তাঁদের পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে হবে—এমন মত ফিকহি গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ রয়েছে।
সুতরাং শুধু সদকা করে দিলেই সব পরিস্থিতিতে দায় শেষ হয়ে গেছে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়। পরবর্তী সময়ে প্রকৃত মালিকের দাবি সামনে এলে তাঁর অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ঋণের ব্যাপারে হাদিসে কঠোর সতর্কতাঋণের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের আত্মা তার ঋণের কারণে আটকে থাকে, যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করা হয়।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৭৮)
আরেক হাদিসে এসেছে, আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তির সব গুনাহ ক্ষমা করা হলেও ঋণ এর ব্যতিক্রম। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৮৬)
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, কারও ওপর তার ভাইয়ের কোনো অধিকার বা দাবি থাকলে দুনিয়াতেই তা মিটিয়ে নেওয়া উচিত। কারণ আখিরাতে দীনার-দিরহাম থাকবে না; তখন নেকি দিয়ে পাওনা পরিশোধ করতে হবে। নেকি না থাকলে পাওনাদারের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫৩৪)
দায়মুক্তির সঠিক পথইসলামি দৃষ্টিতে পাওনাদারকে খুঁজে না পাওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করে অর্থ নিজের কাছে রেখে দেওয়া বা নিজের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রথমে তাঁকে কিংবা তাঁর ওয়ারিশদের সন্ধান করতে হবে। যথাসাধ্য ও দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও কাউকে পাওয়া না গেলে ফিকহি নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁর পক্ষ থেকে ওই অর্থ সদকা করা যেতে পারে।
সদকা করার সময় নিয়ত থাকবে, আল্লাহ তাআলা যেন এর সওয়াব প্রকৃত পাওনাদারের কাছে পৌঁছে দেন। তবে পরে পাওনাদার বা তাঁর ওয়ারিশের সন্ধান পাওয়া গেলে তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
অতএব, ঋণের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—সততা, আন্তরিকতা এবং পাওনাদারের অধিকার রক্ষা। পাওনা পরিশোধের দায় এড়াতে ‘খুঁজে পাচ্ছি না’ অজুহাত গ্রহণ করা ইসলামি আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, জামে তিরমিজি, সহিহ মুসলিম; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি (২/২৯৯-৩০০), আল-মুহিতে বুরহানি (৮/৮৬৬), ফাতাওয়ায়ে সিরাজিয়া (পৃ. ২৪১);।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক