বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ব্রিটেনের সামনে নতুন কৌশলগত সুযোগ

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০২ দুপুর
  • ৪২৮৩ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্য নিজস্ব পররাষ্ট্র ও জ্বালানিনীতির স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তায় আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে জি-৭ জোট ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়ে সংকট মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে দেশটির।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ইসলামিক স্টাডিজের সাবেক ভিজিটিং স্কলার ড. ডায়ানা গালেয়েভার বিশ্লেষণী নিবন্ধে এসব বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর মতে, জ্বালানির সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে বর্তমান অস্থিরতা শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন আনছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে যুক্তরাজ্য

নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে ডিজেলের গড় দাম প্রতি লিটার ২০০ দশমিক ০১ পেনিতে উঠেছিল, যা দেশটির জন্য রেকর্ড। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর দাম বেড়েছিল ৫৬ দশমিক ৮ পেনি বা প্রায় ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে পেট্রলের দাম প্রতি লিটার ১৭৪ দশমিক ৭১ পেনিতে পৌঁছায়।

আন্তর্জাতিক বাজারেও অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। নিবন্ধ অনুযায়ী, মার্চে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১১১ দশমিক ৫৪ ডলারে ওঠে, যা ২০২২ সালের মে মাসে রেকর্ড করা ১১৪ দশমিক ৩৮ ডলারের কাছাকাছি। মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায় তেল পরিশোধন কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে চাপ বাড়ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের আগে বিশ্বে ডিজেলের মোট সরবরাহের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি বিশ্ববাজারে পরিবাহিত হয়। এসব সরবরাহে বিঘ্নের প্রভাব পড়েছে পরিবহন জ্বালানির দামে।

যুক্তরাজ্যের ডিজেল আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। রাশিয়ার সরবরাহ সীমিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রেও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে দেশটিতে ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৫ দশমিক ৮৬ ডলারে পৌঁছেছিল।

মজুত ও শোধনাগার কমে যাওয়ায় ঝুঁকি

জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাজ্যের নিজস্ব সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, দেশটির মজুত দিয়ে আনুমানিক ৪২ দিনের ডিজেলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাজ্যে ১৮টি তেল শোধনাগার থাকলেও বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র চারটি।

শোধনাগারের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তাকে দুর্বল করেছে। বিদেশি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে এ সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট হতে পারে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতেও পড়ছে। নিবন্ধ অনুযায়ী, ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতির হার আগস্টের ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে জি-৭ দেশগুলো জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও ডিজেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বয়ে চার মাসের মধ্যে এ সরবরাহ ছাড়ার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।

ব্রেক্সিটের স্বাধীনতা কতটা কাজে লাগবে

২০২০ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পর যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ব্রেক্সিটের ফলে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি বলে সমালোচকদের মত। তবে বর্তমান সংকটের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে স্বাধীনভাবে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেশটির জন্য নতুন কৌশলগত সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছিল। বছরের প্রথমার্ধে জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্য ছিল।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে নিজস্ব উদ্যোগ বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বিস্তারের সুযোগ রয়েছে।

তবে ব্রেক্সিটের ফলে পাওয়া নীতিগত স্বাধীনতা একাই জ্বালানি সংকটের সমাধান নিশ্চিত করবে না। সীমিত মজুত, শোধনাগারের ঘাটতি ও আমদানিনির্ভরতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং কার্যকর নীতি প্রয়োজন।

মধ্যপ্রাচ্য ও জি-৭-এর সঙ্গে সমন্বয়ের তাগিদ

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা যুক্তরাজ্যের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে জরুরি মজুত ব্যবস্থাপনা, বিকল্প সরবরাহপথ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।

ড. ডায়ানা গালেয়েভার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বর্তমান সংকট যুক্তরাজ্যের সামনে নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে জি-৭ ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াতে পারলে দেশটি নিজের নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায়ও অবদান রাখতে পারে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad