নৈতিক প্রজন্ম গড়তে পরিবারের শিক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৫ দুপুর
  • ৫১৭৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
প্রথম পাঠশালা পরিবার, সন্তানের চরিত্র গঠনে মা-বাবার দায়িত্ব অপরিসীম

সন্তানের নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলি গঠনে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকেই। মা-বাবার আচরণ, পারিবারিক পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ শিশুর চিন্তা-চেতনা এবং ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই সন্তানকে শুধু শিক্ষিত ও সফল পেশাজীবী নয়, বরং সৎ, দায়িত্বশীল ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবারের সচেতন ভূমিকা অপরিহার্য।

কবি হাফিজ ইব্রাহিমের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক আহনাফ আবদুল কাদির তাঁর নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘মা একটি বিদ্যালয়; তাকে যথাযথভাবে গড়ে তুলতে পারলে, একটি সৎ ও উত্তম জাতি গড়ে উঠবে।’ তাঁর মতে, পৃথিবীতে আসার পর শিশু প্রথমে মায়ের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠে। এরপর বাবা, পরিবারের অন্য সদস্য ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে তার সামাজিক আচরণ ও মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে।

ইসলামে পরিবার নৈতিক শিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান

ইসলাম পরিবারকে শুধু সামাজিক কাঠামো হিসেবে দেখে না; বরং ঈমান, নৈতিকতা, শিষ্টাচার ও মানবিক গুণাবলি অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা আত-তাহরিম, আয়াত ৬)

আয়াতটির আলোকে লেখক উল্লেখ করেন, সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা, উত্তম চরিত্র ও আল্লাহভীতি শেখানো মা-বাবার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একইভাবে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমার পরিবারকে সালাতের নির্দেশ দাও এবং তুমি নিজেও এর ওপর অবিচল থাকো।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত ১৩২)

অর্থাৎ, সন্তানের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া প্রয়োজন। ঘরে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা থাকলে শিশু এসব মূল্যবোধ ধারণ করার সুযোগ পায়।

সন্তানের কাছে মা-বাবার আচরণই বড় শিক্ষা

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮২৯)

আরেকটি হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫)

এসব হাদিসের শিক্ষা হলো, প্রকৃত ধার্মিকতা শুধু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উত্তম আচরণ, দায়িত্ব পালন ও সহমর্মিতাও গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবা নিজেরা সত্যবাদিতা, ধৈর্য, দয়া ও ন্যায়পরায়ণতার চর্চা করলে সন্তানের সামনে তার বাস্তব উদাহরণ তৈরি হয়।

প্রযুক্তি ও ভোগবাদী সংস্কৃতিতে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, ভোগবাদী মানসিকতা এবং পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা নতুন প্রজন্মের নৈতিক বিকাশে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অনেক অভিভাবক সন্তানের উন্নত শিক্ষা, প্রযুক্তিগত সুবিধা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হলেও নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি সমান গুরুত্ব দেন না।

লেখকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিশুর চরিত্র গঠনে পারিবারিক পরিবেশের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। পরিবারে সততা, ন্যায়বোধ, ধৈর্য, দয়া, ক্ষমাশীলতা ও আল্লাহভীতির চর্চা থাকলে শিশুর মধ্যেও এসব গুণ বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। বিপরীতে, মিথ্যা, অশান্তি, রূঢ় আচরণ ও অবহেলা তার মানসিক ও নৈতিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সন্তান প্রতিপালনে অবহেলার সুযোগ নেই

ইসলামের ইতিহাসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পারিবারিক জীবনকে দয়া, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও উত্তম আচরণের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে সাহাবায়ে কেরাম নৈতিকতা ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর তুহফাতুল মাওদুদ বি আহকামিল মাওলুদ গ্রন্থে সন্তানকে উপকারী শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে মা-বাবার অবহেলার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। লেখকের উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে, সন্তানের শিক্ষা ও প্রতিপালনে অবহেলা এবং তাকে খেয়ালখুশিমতো চলতে দেওয়ার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

তাই সন্তানকে শুধু ভালো ফলাফল অর্জন কিংবা পেশাগত সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করাই যথেষ্ট নয়। তাকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝানো, প্রতারণা থেকে বিরত রাখা, বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করতে শেখানো এবং দায়িত্বশীল আচরণে অভ্যস্ত করাও জরুরি।

আদর্শ পরিবার গড়লেই নৈতিক সমাজের ভিত্তি শক্ত হবে

লেখকের মতে, প্রতিটি পরিবারে কোরআন তিলাওয়াত, নামাজের গুরুত্ব, সততা, শিষ্টাচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা থাকা প্রয়োজন। সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি মা-বাবার নিজেদের জীবনেও সেই মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে পরিবারের ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে নৈতিকতা ও মানবিকতার চর্চা জোরদার হলে তার ইতিবাচক প্রভাব সমাজেও পড়তে পারে। আর ন্যায়বোধ, দায়িত্বশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণের ভিত্তি শক্তিশালী হয়।

তথ্যসূত্র: : ধর্মীয় উদ্ধৃতির সূত্র হিসেবে নিবন্ধে উল্লেখ রয়েছে—পবিত্র কোরআনের সুরা আত-তাহরিম (৬) ও সুরা ত্বহা (১৩২), সহিহ বুখারি (৮৯৩), সহিহ মুসলিম (১৮২৯), জামে তিরমিজি (৩৮৯৫) এবং ইমাম ইবনুল কাইয়্যিমের তুহফাতুল মাওদুদ বি আহকামিল মাওলুদ গ্রন্থ।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad