ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে জোর-জবরদস্তি গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ, তাদের ধর্মীয় অধিকারকে সম্মান এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইসলামি শিক্ষায় ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শের উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়ে মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমী তাঁর নিবন্ধে বলেন, মানুষকে জোর করে কোনো ধর্মে দীক্ষিত করা ইসলামের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং যুক্তি, সুন্দর আচরণ ও আদর্শের মাধ্যমে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানানোর সুযোগ রয়েছে।
ধর্ম গ্রহণে জবরদস্তি নয়
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৬)
এই আয়াতের আলোকে লেখক উল্লেখ করেন, ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের ওপর বলপ্রয়োগ করা উচিত নয়। ইসলামের শিক্ষা মানুষের সামনে সত্য তুলে ধরা এবং যুক্তি ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে আহ্বান জানানোর ওপর গুরুত্ব দেয়।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সুরা আল-কাফিরুনের ষষ্ঠ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম এবং আমার জন্য আমার ধর্ম।’ (সুরা আল-কাফিরুন, আয়াত ৬)
এ ছাড়া সুরা আল-কাহফের ২৯ নম্বর আয়াতে সত্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরার পর তা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের প্রসঙ্গ এসেছে। লেখকের মতে, এসব আয়াত ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়ে জবরদস্তি না করার নীতিকে স্পষ্ট করে।
অমুসলিমদের ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার
লেখক তাঁর নিবন্ধে উল্লেখ করেন, ইসলামি শিক্ষায় অমুসলিমদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় আইন ও জনশৃঙ্খলার সীমার মধ্যে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনা এবং ধর্মীয় উৎসব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করা সামাজিক সম্প্রীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, মুসলিম সমাজে বসবাসরত অমুসলিমদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনযাপনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি ইসলামি আলোচনায় স্থান পেয়েছে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আচরণে ন্যায়বিচার, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
মহানবীর জীবনাদর্শে সহনশীলতা
নিবন্ধে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে ধর্মীয় সহনশীলতার শিক্ষা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। লেখকের বর্ণনায়, নজরান থেকে আগত খ্রিষ্টান প্রতিনিধিদলের উপাসনা নিয়ে একটি ঘটনা ধর্মীয় সহাবস্থানের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য হাদিস ও ইতিহাসগ্রন্থের সূত্র যাচাই করা জরুরি। একইভাবে, ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করতে হলে কোরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি যথাযথ প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
ইতিহাস ও সমকালীন প্রেক্ষাপট
মুসলিম শাসনামলে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অধিকার ও সহাবস্থানের ইতিহাস তুলে ধরে লেখক পরমতসহিষ্ণুতার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। পাশাপাশি ভারতের সমকালীন পরিস্থিতিতে মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার, উপাসনালয় এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথাও উল্লেখ করেছেন।
তবে মসজিদ ধ্বংসের সংখ্যা, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নির্যাতন কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংঘটিত ঘটনার মতো দাবির ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। যাচাই ছাড়া এ ধরনের পরিসংখ্যানকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
সম্প্রীতিই শান্তিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি
লেখকের মতে, জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে প্রত্যেকের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক। ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্য যেন বিদ্বেষ, বৈষম্য কিংবা সংঘাতের কারণ না হয়, সে বিষয়ে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র—সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়ে। পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সহনশীলতার ভিত্তিতে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথও সুগম হয়।
তথ্যসূত্র: মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমীর ‘অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা’ শীর্ষক নিবন্ধ, প্রকাশিত ১৬ অক্টোবর ২০২৬। নিবন্ধে উদ্ধৃত ধর্মীয় সূত্র: পবিত্র কোরআনের সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৬; সুরা আল-কাফিরুন, আয়াত ৬; সুরা আল-কাহফ, আয়াত ২৯।
লেখক পরিচিতি: মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমী, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, মাইলস্টোন কলেজ, উত্তরা, ঢাকা।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক