ম্যারাথনের ইতিহাসে বিশ্ব রেকর্ড

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫১ সকাল
  • ১৮৮৭৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

ম্যারাথনের ইতিহাসে বিশ্ব রেকর্ড


এক সময় যেটিকে কল্পনাতীত বলা হতো, সেটিই সোমবার বাস্তবে রূপ দিলেন সেবাস্টিয়ান সাওয়ে (Sebastian Sawe)। মাত্র এক ঘণ্টা ৫৯ মিনিট ৩০ সেকেন্ড এই সময়ে ৪২.১৯৫ কিলোমিটার দৌড়ে শেষ করে ম্যারাথনের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন তিনি। লন্ডন ম্যারাথনের এই সকালের পারফরম্যান্স কেবল একটি জয় নয়, এটি ক্রীড়ার সীমা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। তথ্যসূত্র :বিবিসি স্পোর্ট


অপ্রত্যাশিতের আরেক নাম সাওয়ে

সেবাস্টিয়ান সাওয়ের ক্যারিয়ার শুরু থেকেই চমকপ্রদ। ২০২২ সালে সেভিল হাফ ম্যারাথনে প্রথমবার রাস্তায় দৌড়াতে নেমেছিলেন। কিন্তু ১০ কিলোমিটার পার হতেই সবাইকে পেছনে ফেলে একাই এগিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত জিতে নেন রেস, সেটিও আবার কোর্স রেকর্ড গড়ে।

এরপর ২০২৪ সালে ভ্যালেন্সিয়া ম্যারাথনে নিজের প্রথম ম্যারাথনেই ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম অভিষেক করেন। তার সময় ছিল ২:০২:০৫, যা কিংবদন্তি কেলভিন কিপটামের অভিষেক সময়ের থেকে মাত্র ১২ সেকেন্ড পিছিয়ে। এসব ইঙ্গিত দিয়েছিল, সাওয়ের মধ্যে কিছু বিশেষ আছে। কিন্তু কেউই প্রস্তুত ছিল না লন্ডনের সেই ঐতিহাসিক দিনের জন্য।


‘আমি নিজেও ভাবিনি’

ইতিহাস গড়ার ২৪ ঘণ্টা পর সাওয়ে বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, ‘এই সময়টা আমার মাথায়ই ছিল না। আমি শুধু শিরোপা ধরে রাখার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। বিশ্ব রেকর্ড ভাঙার কথা ভাবিনি।’ ৩১ বছর বয়সী এই কেনিয়ান দৌড়বিদের দাবিÑ এটাই শেষ নয়। ‘আরো দ্রুত দৌড়ানো সম্ভব। এমনকি ১:৫৮-ও সম্ভব,’ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেন তিনি।


রিফট ভ্যালি থেকে বিশ্ব মঞ্চে

কেনিয়ার রিফট ভ্যালিতে জন্ম নেয়া সাওয়ের শৈশব ছিল সংগ্রামের। তার বাবা ছিলেন এক জন ভুট্টাচাষি। বেশির ভাগ সময় তাকে বড় করেছেন তার দাদি। ২০১৭ সালে দৌড়বিদ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি চলে যান ইটেন, যা ‘চ্যাম্পিয়নদের ঘর’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু শুরুটা সহজ ছিল না। প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ঠিক তখনই জীবনে আসেন ইটালিয়ান কোচ ক্লদিও বেরার্ডেলি। তারই তত্ত্বাবধানে ট্র্যাক ছেড়ে ম্যারাথনে মনোযোগ দেন সাওয়ে, আর সেখানেই খুলে যায় সম্ভাবনার দরজা।


কোচের চোখে ‘স্পেশাল ওয়ান’

সাওয়েকে শুরু থেকেই বেরার্ডেলি ‘স্পেশাল’ বলে মনে করতেন। তার মতে, সাওয়ের সাফল্যের পেছনে রয়েছে শারীরিক সক্ষমতা ও অসাধারণ মানসিকতা। এখনো তিনি বিশ্বাস করেন, মাত্র চারটি ম্যারাথন দৌড়ানো এই এথলেট তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌছাননি।

২০২৫ সালে বার্লিন ম্যারাথন ও লন্ডনে জয় তুলে নিয়ে নিজের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করেন সাওয়ে।


বাধা পেরিয়েই মহাকাব্য

লন্ডনের বিশ্ব রেকর্ডের আগে সাওয়ের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। বার্লিন ম্যারাথনের পর তার পায়ে স্ট্রেস ফ্র্যাকচার ধরা পড়ে। জানুয়ারিতে পিঠের চোটে প্রায় দৌড় ছেড়ে দেয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই অবস্থায় ফেব্রুয়ারির শুরুতে আবার প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি। তবুও লন্ডনে এসে ইতিহাস গড়ে ফেলেন, যে কোর্সটি তুলনামূলক ধীরগতির বলে বিবেচিত এবং যেখানে ২০০২ সালের পর কোনো পুরুষ বিশ্ব রেকর্ড হয়নি।


কিপচোজের উত্তরাধিকার, নতুন অধ্যায়

২০১৯ সালে এলয়ড কিপচোজ প্রথমবার দুই ঘণ্টার নিচে ম্যারাথন শেষ করলেও সেটি ছিল নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে, রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃত নয়। সাওয়ের কীর্তি তাই ভিন্ন মাত্রার, এটি আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতায় অর্জিত। কিপচোজ নিজেও স্বীকার করেছেন, ‘আজকের দিনটি ম্যারাথনের ইতিহাসে এক নতুন সূচনা।’


একই দিনে তিন বিস্ময়

লন্ডনের সেই রেসে আরেক চমক ছিল ইয়োমিফ কেজেলচা এবং জ্যাকব কিপলিমোও অসাধারণ পারফরম্যান্স করেন। কেজেলচা দুই ঘণ্টার নিচে নামেন, আর কিপলিমো ভেঙে দেন আগের বিশ্ব রেকর্ড।


প্রযুক্তি, পরিশ্রম ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন

ফিনিশ লাইনে সাওয়ে তুলে ধরেন এডিডাস এডিওস ৩ তার জুতার পাশে লেখা ছিল ঐতিহাসিক সময়টি। এই জুতার ওজন মাত্র ৯৯ গ্রাম, আগের মডেলের তুলনায় ৩০ শতাংশ হালকা। কম্পানির দাবি, এটি দৌড়ের শক্তি ফিরিয়ে দিতে ১১ শতাংশ বেশি কার্যকর।

তবে প্রযুক্তি একা যথেষ্ট নয়। সাওয়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দৌড়ান, প্রতিদিন গড়ে ৩০ কিলোমিটার। উচু ভূমিতে এই অনুশীলনই তার সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।


পুষ্টি ও কৌশলের নিখুত সমন্বয়

রেসের সময় প্রতি ঘণ্টায় ১১৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করেন তিনি। সকালে খেয়েছিলেন মধু মাখানো রুটি ও চা। তার গড় গতি ছিল প্রতি কিলোমিটারে দুই মিনিট ৫০ সেকেন্ড, যা মানব শরীরে সহনশীলতার এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।


ডোপিং বিতর্কের ছায়া ও স্বচ্ছতার বার্তা

কেনিয়ার এথলেটিক্সে ডোপিং ইসু দীর্ঘদিনের। রুথ চেপনেটিচের মতো স্টাররাও বিতর্কে জড়িয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে নিজের স্বচ্ছতা প্রমাণে সাওয়ে এগিয়ে এসেছেন। এডিডাস ৫০ হাজার ডলার দিয়েছে এথলেটিক ইনটৃগিটি ইউনিউটকে, যাতে নিয়মিত পরীক্ষা করা যায়।


সামনে আরো বড় কিছু

সাওয়ের কোচ যেমন বিশ্বাস করেন, তেমনি সাওয়ে নিজেও মনে করেন, তার সেরাটা দেয়ার সময় এখনো আসেনি। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে, এই বিস্ময়কর দৌড়বিদের পরবর্তী পদক্ষেপ কি? কারণ, তিনি এরই মধ্যেই প্রমাণ করেছেন, অসম্ভব বলে কিছু নেই।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad