ইসরাইলের নেসেট নির্বাচন আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সম্প্রতি প্রকাশিত কয়েকটি জরিপে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদের জনপ্রিয়তা কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এই নির্বাচন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার বিরুদ্ধে ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে ইসরাইলের আদালতে মামলা চলছে। পাশাপাশি গাজা উপত্যকায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
নেতানিয়াহুর জন্য ক্ষমতায় থাকা সম্ভাব্য ফৌজদারি শাস্তি এড়ানোর অন্যতম পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, ইসরাইলের আদালতে তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলার বিচার অব্যাহত রয়েছে।
নেতানিয়াহুর প্রত্যাশা, নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবারও সরকার গঠন করবেন তিনি। তবে তা সম্ভব না হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে নেতানিয়াহু ও বিরোধী দল—কেউই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জোট সরকার গঠন করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান সরকারই ক্ষমতায় থাকতে পারে।
জরিপে পিছিয়ে নেতানিয়াহুর জোটইসরাইলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমে রোববার সন্ধ্যায় প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, এখনই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫২টি আসন পেতে পারে। অনারব বিরোধী দলগুলো পেতে পারে ৫৫টি আসন। আরব আইনপ্রণেতাদের জন্য বরাদ্দ হতে পারে ১৩টি আসন।
১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠন করতে প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন। ফলে বর্তমান জরিপের ফল অনুযায়ী, কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না।
বিরোধী দলগুলো সরকার গঠনের জন্য আরব আইনপ্রণেতাদের সমর্থন চাইতে পারে। তবে তাদের অধিকাংশ নেতা এখনো এ ধরনের জোটের বিরোধিতা করছেন।
আইজেনকোটের উত্থাননির্বাচনী সমীকরণে এখন সবার নজর ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকোটের দিকে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তাকে সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আইজেনকোটের নতুন দল ইয়াশা সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। জরিপে দলটি লিকুদকেও পেছনে ফেলেছে। ইয়াশা ২৪টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিপরীতে লিকুদের সম্ভাব্য আসন ২১টি।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কে বেশি যোগ্য—জরিপে এমন প্রশ্নের উত্তরেও আইজেনকোট এগিয়ে রয়েছেন। ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা তাকে পরবর্তী সরকার পরিচালনার জন্য উপযুক্ত বলে মনে করেছেন। নেতানিয়াহুর পক্ষে মত দিয়েছেন ৩৭ শতাংশ।
ডানপন্থী ভোট ধরে রাখার চেষ্টাডানপন্থী দলগুলোর ভোট ধরে রাখতে নেতানিয়াহু নানা রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করছেন। কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থন ধরে রাখতে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয়ে তিনি নীরব ভূমিকা পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নেতানিয়াহু এবং কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের দাবি, ২০২২ সালের শেষ দিকে গঠিত সরকার অধিকৃত পশ্চিম তীরে ১০৪টি অবৈধ বসতি নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। একই সময়ে ১৬০টি কৃষি বসতি চৌকি স্থাপনের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।
তবে ডানপন্থী শিবিরে নতুন দলগুলোর উত্থান নেতানিয়াহুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। তার আশঙ্কা, এসব দলের কারণে হাজার হাজার ডানপন্থী ভোট বিভক্ত হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে তিনটি আরব দলের জোটবদ্ধ হয়ে ‘জয়েন্ট লিস্ট’ গঠনের সম্ভাবনাও নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এর ফলে আরব ভোটারদের উপস্থিতি বাড়তে পারে।
আগের জরিপগুলোতে আরব দলগুলো ১০টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক জরিপে সেই সম্ভাবনা বেড়ে অন্তত ১৩টি আসনে দাঁড়িয়েছে।
ইসরাইলের প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার ২০ শতাংশ আরব নাগরিক। তাদের ভোটার উপস্থিতি বাড়লে ছোট ডানপন্থী দলগুলোর নির্বাচনী সীমা পার হওয়ার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। এতে নেতানিয়াহুর জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন হারাতে পারে এবং বিরোধীদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
ডানপন্থী দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টাডানপন্থী ভোট বিভক্ত হওয়া ঠেকাতে ছোট দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু। তিনি ইতামার বেন-গভিরের কট্টর ডানপন্থী জিউইশ পাওয়ার পার্টি এবং স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টিকে একীভূত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।
এখন স্মোট্রিচ এবং লিকুদের সাবেক সংসদ সদস্য মোশে ফাইগলিনের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু।
ইসরাইলি চ্যানেল ২৪ সোমবার জানিয়েছে, নির্বাচনী তালিকা জমা দেওয়ার সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় নেতানিয়াহু স্মোট্রিচ, ফাইগলিন এবং বেন-গভির অথবা ওফার উইন্টারের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় ডানপন্থী জোট গঠনের জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
চ্যানেলটির প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক লিকুদ নেতার বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘রাশিয়ান রুলেটের’ সঙ্গে তুলনা করে বলেন, কেউই এমন ঝুঁকি নিতে চায় না। তার ভাষ্য, ডানপন্থী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তারা সফল হচ্ছেন না।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক