সার মজুত ও বেশি দামে বিক্রি ঠেকাতে মাঠে গোয়েন্দা নজরদারি

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৫ বিকাল
  • ২৯৩৩ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করা হলেও বিভিন্ন এলাকায় চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন কৃষকরা। কোথাও ডিলারের গুদামে সার না থাকার কথা বলা হলেও অন্যত্র তা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আবার কোথাও অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির ঘটনাও ধরা পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে সরকার।

সার সংকটের কারণ অনুসন্ধান ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ২৫ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি কমিটি গঠন করে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কমিটি সার বিতরণ ও ডিলার ব্যবস্থাপনার মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কমিটি সারা দেশের ডিলারদের বরাদ্দ, সার উত্তোলন ও বিতরণের তথ্য সংগ্রহ করে অনিয়ম শনাক্তের কাজ করছে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কমিটির সদস্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, সারের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে কাজ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক, কৃষি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে। সার সরবরাহে বাধা সৃষ্টি কিংবা অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কিছু ডিলারের বিরুদ্ধে কোনো কোনো এলাকায় সার সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সার নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগের বিষয়ে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, সামনে রবিশস্যের মৌসুম হওয়ায় অনেক কৃষক আগেভাগে সার কিনে মজুত করছেন। পাশাপাশি কোথাও কোথাও সার নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে গিয়ে কৃষকদের বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করছেন।

সরকার সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেটদের মাঠে গিয়ে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সার সংকটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কারসাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ থেকে তুলনামূলক বেশি অভিযোগ আসছে। কেউ রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বিভিন্ন জেলা থেকে গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি দামের দ্বিগুণে সার বিক্রির অভিযোগ

সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলা হলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঝিনাইদহে সরকার নির্ধারিত মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ দামে টিএসপি বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি টিএসপির দাম ২৭ টাকা হলেও বিভিন্ন বাজারে তা ৫০ থেকে ৫২ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

হরিশঙ্করপুর ইউনিয়নের এক ডিলারের বিরুদ্ধে ক্যাশ মেমো ছাড়াই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সেখানে প্রতি কেজি ইউরিয়া ২৭ টাকার পরিবর্তে ৩২ টাকা এবং টিএসপি ২৭ টাকার পরিবর্তে ৫০ থেকে ৫২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। অন্য একটি দোকানে ২০ টাকা কেজি দরের এমওপি ২৮ থেকে ৩৫ টাকা এবং ২১ টাকা দরের ডিএপি ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের কৃষক গোলাম নবী বলেন, চার বিঘা জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করেছেন। টিএসপি প্রয়োজন হওয়ায় ডিলারের কাছে সরকারি দামে সার চাইলে তাকে সার শেষ হয়ে গেছে বলে জানানো হয়। পরে অন্য এক কৃষকের মাধ্যমে একই সার ৫০ টাকা কেজি দরে কিনতে হয়েছে।

শৈলকুপার রাণীনগর গ্রামের কৃষক ইসহাক আলী বলেন, ডিলারের কাছে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও সরকারি দামে সার পাওয়া যায় না। বেশি টাকা দিলে চাহিদামতো সার পাওয়া যায়। বিষয়টি কৃষি অফিসে জানিয়েও কার্যকর প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেশি দামে বিক্রি করছেন। এরই মধ্যে কয়েকজন ডিলারকে জরিমানা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন জানান, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান, জব্দ বিপুল সার

সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের চিত্র প্রশাসনের অভিযানে ধরা পড়ছে। গত বৃহস্পতিবার রাজশাহীর দুর্গাপুরে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৬৭০ বস্তা সার জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। বাড়িতে বিপুল পরিমাণ সার মজুতের ঘটনায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।

দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা ফারজানা বলেন, অবৈধভাবে সার মজুতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দিনাজপুরের খানসামায় বৃহস্পতি ও শুক্রবার পৃথক তিনটি অভিযানে অবৈধ এবং অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত মজুত করা ১ হাজার ৫৭৭ বস্তা সার জব্দ করেছে প্রশাসন। এসব ঘটনায় দুই ডিলারকে মোট ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বরাদ্দ শেষ, চাহিদা মেটেনি

কুড়িগ্রামের রাজারহাটে আমন মৌসুমে সারের চাহিদা ও সরবরাহ নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। নাজিমখান ইউনিয়নের এক বিসিআইসি ডিলারের সেপ্টেম্বর মাসের ৪৪ টন ইউরিয়া বরাদ্দ মাত্র ১০ দিনেই শেষ হয়ে যায়। একই সময়ে উমর মজিদ ইউনিয়নের আরেক ডিলারকে বরাদ্দের অতিরিক্ত ১০ টন উপবরাদ্দ দেওয়া হলেও কৃষকদের চাহিদা মেটেনি।

ফলে প্রয়োজনের সময়ে সার না পেয়ে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরতে হচ্ছে কৃষকদের। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফেরার অভিযোগ করেছেন অনেকে।

দেশে মজুত প্রায় ১২ লাখ টন

এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে সারের মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক। গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মোট ১১ লাখ ৯৩ হাজার টন সার মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ৩ লাখ ৯৪ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৩০ হাজার টন, ডিএপি ২ লাখ ৯৪ হাজার টন এবং এমওপি ১ লাখ ৭৫ হাজার টন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের মজুত পরিস্থিতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশে মোট সার মজুত ছিল ১১ লাখ ৯ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এবার মজুত বেড়েছে প্রায় ৯২ হাজার টন।

সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়াতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কমিটি মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। কমিটির সদস্য সম্প্রসারণ অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, সারা দেশের কৃষি বিভাগের উপপরিচালকদের সঙ্গে প্রত্যেক জেলার জন্য একজন করে কর্মকর্তা যুক্ত করা হয়েছে। তারা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন।

তিনি বলেন, ডিলাররা নির্ধারিত সময়ে বরাদ্দ পাওয়া সার উত্তোলন করছেন কি না এবং উত্তোলনের পর তা যথাযথভাবে বিতরণ করছেন কি না—এসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। কোনো সমস্যা বা অনিয়ম পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

শনিবার কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাই সার নিয়ে কৃষকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে সার মজুতের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। তবে একটি অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে সার মজুতের চেষ্টা করছে। তাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, প্রশাসনের সরেজমিন তদারকি, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সার বিতরণে অনিয়মের উৎস শনাক্তের চেষ্টা চলছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুত কিংবা নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে সার বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। তবে কৃষকদের ভোগান্তি কমাতে মাঠপর্যায়ের এসব উদ্যোগ দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad