বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা, উচ্চ সুদের হার, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা, ভালো কোম্পানির নতুন শেয়ারের ঘাটতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ সামষ্টিক অর্থনীতির নানা চাপ বাজারে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন গুজব যুক্ত হওয়ায় অনেকে খবরের সত্যতা যাচাই না করেই শেয়ার বিক্রি করছেন।
এক মাস ধরে পতনদীর্ঘদিন ধরেই দেশের শেয়ারবাজারে মন্দাভাব ছিল। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারে।
দীর্ঘ মন্দার প্রভাবে চলতি বছরের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪ হাজার ৯১০ পয়েন্টে নেমেছিল। পরে ঘুরে দাঁড়িয়ে একপর্যায়ে সূচকটি ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ওপরে ওঠে। এতে দীর্ঘদিনের লোকসানে থাকা বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি কিছুটা কমে আসে।
তবে সম্প্রতি বাজারে আবারও বড় ধরনের পতন শুরু হয়েছে। প্রায় এক মাস ধরে দরপতনের মধ্যে রয়েছে শেয়ারবাজার। ফলে বিনিয়োগকারীদের লোকসান ফের বাড়ছে। বিনিয়োগ করা পুঁজি হারানোর শঙ্কার পাশাপাশি তাদের মধ্যে নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তা জানান, কিছু বড় বিনিয়োগকারীর শেয়ার লেনদেনের তথ্য ডিএসই ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নিচ্ছে। এসব বিনিয়োগকারীর কারণে যেসব শেয়ারের দাম বাড়ছিল, সেগুলো এখন ধারাবাহিকভাবে দর হারাচ্ছে। তাদের অনুসরণ করে লেনদেন করা বিনিয়োগকারীরাও আরও দর কমার আশঙ্কায় শেয়ার বিক্রি করছেন। এতে বাজারে পতনের মাত্রা বাড়ছে।
তবে বর্তমান দরপতনের যৌক্তিক কোনো কারণ নেই বলে মনে করেন পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, বাজারে যেভাবে পতন হচ্ছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত। নতুন কমিশন বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর কথা। তবে বাজারে তারল্য সংকট রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ডিন ড. আল আমীন বলেন, দেশে এমন বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি, যার কারণে শেয়ারবাজারে এত বড় ধস নামতে পারে। তবে নতুন কমিশন এমন কোনো চমক দেখাতে পারেনি, যাতে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়। কমিশন কী করছে, তা না বলে ভবিষ্যতে কী করবে—এমন বক্তব্যে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না।
বাজারচিত্ররোববার ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ৩৩৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। বিপরীতে মাত্র ২৭টির দাম বেড়েছে এবং ২১টির দাম অপরিবর্তিত ছিল।
এদিন ডিএসইএক্স ৯৬ পয়েন্ট কমে সাড়ে তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে। ডিএসইর বাছাই করা ৩০টি ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ২৩ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৭২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১৯ পয়েন্ট কমে হয়েছে ১ হাজার ৮৫ পয়েন্ট।
লেনদেনের শীর্ষে ছিল এনভয় টেক্সটাইল। কোম্পানিটির ২৯ কোটি ২৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের ১৯ কোটি ১১ লাখ এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলের ১৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
লেনদেনের শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আরও ছিল সায়হাম টেক্সটাইল, মালেক স্পিনিং, এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, সাউথইস্ট ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, সায়হাম কটন ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।
অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরনের দরপতন দেখা গেছে। সেখানে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২০১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৫টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। কমেছে ১৩৮টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১৮টির দাম।
এতে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৫০ পয়েন্ট কমেছে। দিনটিতে সিএসইতে ১৪ কোটি ২৪ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স