ব্যাংকঋণের ৩৫ হাজার কোটি টাকা: নজরুলের বিদেশি সম্পদের সন্ধানে দুদক

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২২ বিকাল
  • ২৬৮৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
জার্সির ব্যাংকে ৫৩ লাখ পাউন্ড জব্দের নির্দেশ | ২৬ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার তথ্য | বিদেশে অর্থ সরানোর নানা কৌশলের অভিযোগ

ব্যাংকঋণের নামে দেশের ২৬টি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া এবং এর একটি বড় অংশ বিদেশে পাচারের অভিযোগে নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিদেশি সম্পদের অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যুক্তরাজ্য, আইল অব ম্যান, জার্সি ও হংকংয়ে তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জার্সির ইউবিএস ব্যাংকে নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তাঁর স্ত্রী নাসরিন ইসলামের প্রকৃত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের হিসাবে থাকা ৫৩ লাখ পাউন্ড জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবির এ আদেশ দেন।

দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, নজরুল ইসলাম মজুমদার, তাঁর পরিবারের সদস্য ও সহযোগীরা বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে ২৬টি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। এর একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জার্সির হিসাবে ৫৩ লাখ পাউন্ড

দুদকের অনুসন্ধানে নজরুলের বিদেশি সম্পদের তালিকায় ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। আইল অব ম্যানের ঠিকানায় নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালের ১৭ মে প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছরের ২ অক্টোবর জার্সির ইউবিএস ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির নামে হিসাব খোলা হয়।

গত ৬ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, ওই ব্যাংক হিসাবে ৫ দশমিক ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় ৫৩ লাখ পাউন্ড জমা ছিল। দুদকের অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিক হিসেবে নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তাঁর স্ত্রী নাসরিন ইসলামের নাম উঠে এসেছে।

অর্থ ও সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কায় সেগুলো জব্দ বা অবরুদ্ধ করার আবেদন করে দুদক। আদালত জার্সির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যাংক হিসাব এবং ওই প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

২৬ ব্যাংকে ঋণের জাল

দুদকের অনুসন্ধানে নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একই কৌশলে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া, সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ নেওয়া এবং বিশেষ সুবিধায় ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিলের অভিযোগও রয়েছে।

অনুসন্ধানে এমন তথ্যও এসেছে, এক ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটি ব্যাংক থেকেই নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে দুই হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৯৮ কোটি টাকা বিশেষ বিবেচনায় দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনেও এসব ঋণ নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। নাসা গ্রুপের তৈরি পোশাক ও সুতা ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ঋণের বড় অংশ দেওয়া হয়। এসব ব্যাংকের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি—উভয় ধরনের ব্যাংকই রয়েছে।

দুদকের সর্বশেষ অনুসন্ধানে নাসা গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

বিদেশে অর্থ সরানোর অভিযোগ

দুদকের অনুসন্ধানে ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থের একটি অংশ দেশের বাইরে স্থানান্তরের বিভিন্ন তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে ব্যবহার করে অর্থ সরানোর অভিযোগ পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আমদানি পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ বিদেশে পাঠানো, রপ্তানি পণ্যের অর্থ দেশে না এনে বিদেশে রেখে দেওয়া এবং কম মূল্য দেখিয়ে বাকি অর্থ অন্য পথে স্থানান্তরের মতো কৌশল ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।

বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমেও অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, হংকং, আইল অব ম্যান ও জার্সিতে নজরুলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক কোম্পানির তথ্য পেয়েছে দুদক। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সম্পদ কেনার বিষয়ও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।

ব্যাংক খাতে প্রভাবের অভিযোগ

নজরুল ইসলাম মজুমদার দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। একই সময়ে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদক ও বিভিন্ন অনুসন্ধানে তাঁর ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের নেতৃত্ব, সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগকে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে।

সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি ও তহবিলের নামে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে ব্যাংক খাতের একটি বড় অংশে তাঁর প্রভাব ছিল বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।

তবে নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad