আস্থার সংকট কাটিয়ে বীমা খাতকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৯ দুপুর
  • ৩০১১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট, তথ্যের অস্বচ্ছতা এবং বকেয়া বীমা দাবি নিয়ে জটিলতায় থাকা দেশের বীমা খাতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বকেয়া দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি, তথ্য গোপনের সুযোগ বন্ধ এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে খাতটিকে স্বচ্ছ ও টেকসই করার পরিকল্পনা নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।

আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেছেন, বীমা দাবি নিষ্পত্তি করাই এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। বর্তমানে দাবি নিষ্পত্তির হার প্রায় ৫৭ শতাংশ, যা উদ্বেগজনক। এ অবস্থায় পুরোনো দাবি অগ্রাধিকার দিয়ে পরিশোধের পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সম্প্রতি ‘আমার দেশ’-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বীমা খাতের বর্তমান সংকট, তথ্যের অস্বচ্ছতা, ডিজিটাল রূপান্তর, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এসব কথা বলেন মীর নাদিয়া নিভিন।

তথ্যের অস্বচ্ছতা বড় চ্যালেঞ্জ

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, লাইফ ও নন-লাইফ—উভয় খাতের অনেক বীমা কোম্পানির তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দেওয়া তথ্য সব সময় কোম্পানির প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলন করে না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে একাধিক সার্ভার থাকায় ব্যবসা, প্রিমিয়াম আয় ও আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

তার মতে, শুধু আর্থিক প্রতিবেদন দেখে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। ২০২৬ সালে বসে ২০২৫ সালের অডিট প্রতিবেদন পাওয়া গেলে বর্তমান পরিস্থিতি কার্যকরভাবে তদারকি করাও কঠিন।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পুরোপুরি রিস্ক-বেজড সুপারভিশন বা ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে কোম্পানির দেওয়া তথ্য, তথ্যের ঘাটতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে আইডিআরএ প্রথম এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তিনি।

দাবি পরিশোধে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’

বীমা দাবি পরিশোধে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ নীতি অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে আইডিআরএ। অর্থাৎ আগে করা দাবি আগে নিষ্পত্তি করতে হবে। চেয়ারম্যানের অভিযোগ, অনেক কোম্পানি পুরোনো দাবিদারদের অর্থ না দিয়ে মামলা করা গ্রাহকদের আগে অর্থ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, কোনো কোম্পানি সম্পদ বিক্রি করে অর্থ পেলে তা পৃথক ব্যাংক হিসাবে রাখতে হবে। ওই অর্থ থেকে ধারাবাহিকভাবে পুরোনো দাবি পরিশোধ করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়া আইডিআরএর তত্ত্বাবধানে থাকবে এবং প্রতিটি কোম্পানিতে একটি করে অডিট টিম কাজ করবে।

চালু হচ্ছে ইউনিক পলিসি আইডি

বীমা খাতে ডিজিটাল স্বচ্ছতা বাড়াতে ব্যাংক হিসাব নম্বরের মতো একটি অভিন্ন ‘ইউনিক পলিসি আইডি’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পুরো খাতে এ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে আইডিআরএ।

এই ব্যবস্থা চালু হলে ভুয়া প্রিমিয়াম দেখানো ও তথ্য গোপনের সুযোগ কমবে। পাশাপাশি নন-লাইফ বীমায় এলসি খোলার আগে ইউনিক কভার নোট আইডি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমের মাধ্যমে এই তথ্য যাচাই করা যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও বিএসইসির সঙ্গে সমন্বয়

বীমা কোম্পানিগুলোর তথ্য গোপনের সুযোগ বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংক হিসাব শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একইভাবে বিএসইসির সঙ্গেও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।

অভিযোগ নিষ্পত্তিতে আসছে মোবাইল অ্যাপ

গ্রাহকদের অভিযোগ সরাসরি গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ‘ইনসু-কমপ্লেইন্ট’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা দূরে না গিয়ে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগ একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানি ও আইডিআরএর ডেটাবেসে পৌঁছে যাবে।

অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ১৫ দিনকে ‘হলুদ’ এবং ৩০ দিনকে ‘লাল’ এজিং হিসেবে বিবেচনা করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি না হলে আইডিআরএ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে।

দুর্নীতিতে ছাড় নয়

বীমা কোম্পানি কিংবা আইডিআরএর কর্মকর্তা—কেউ দুর্নীতিতে জড়ালে ছাড় দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট করেছেন মীর নাদিয়া নিভিন।

তার ভাষ্য, কোনো কোম্পানি আইডিআরএর কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করলে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইভাবে আইডিআরএর কোনো কর্মকর্তা কোনো কোম্পানির কাছে ঘুষ চাইলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৫০ জন জনবল দিয়ে ৮২ কোম্পানি তদারকি

আইডিআরএর জনবল সংকটকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, মাত্র প্রায় ১৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে ৮২টি বীমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ৭ হাজার কর্মী নিয়ে ব্যাংকিং খাত তদারকি করে।

এ ছাড়া ২০১০ সালের বীমা আইন বর্তমান আর্থিক খাতের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সময়ের সঙ্গে আইনটি হালনাগাদ করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

তবে আইডিআরএর নির্দেশনা না মানলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির জন্য ব্যবসা পরিচালনা কঠিন করে দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেন চেয়ারম্যান। তার মতে, পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান দায়িত্ব।

দক্ষতা বাড়াতে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সহায়তা

আইডিআরএর কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহযোগিতায় বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য কর্মকর্তাদের প্রস্তুত করা হবে।

দাবি পরিশোধে গড়িমসি করা কোম্পানিগুলোর মালিক ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও বৈঠক করেছে আইডিআরএ। চেয়ারম্যান বলেন, আগের পর্ষদ কী করেছে তা বিবেচ্য নয়; বর্তমান ব্যবস্থাপনাকেই পলিসিহোল্ডারদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

প্রয়োজনে প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম বন্ধ, লাইসেন্স বাতিল কিংবা সলভেন্সি মার্জিনসংক্রান্ত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার মতো ক্ষমতা আইডিআরএর রয়েছে বলেও জানান তিনি।

সংস্কারে গণমাধ্যমের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ

বীমা খাতের সংস্কারে গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, কোম্পানিগুলো অনেক সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সঠিক তথ্য দেয় না। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে তিনি খাতটির প্রকৃত সমস্যাগুলো সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন এবং সেই অনুযায়ী সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন।

বীমা খাতকে দুর্নীতিমুক্ত ও গ্রাহকবান্ধব করতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad