নবীনগর থানার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাসে থানায় ১৩টি হত্যা মামলা এবং ২৪টি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড হয়েছে। এসব অপমৃত্যুর মধ্যে গলায় ফাঁস দিয়ে ১০ জন এবং কীটনাশক পান করে সাতজন আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যাকারীদের পাঁচজন পুরুষ ও পাঁচজন নারী। কীটনাশক পানকারীদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও চারজন নারী। অন্যরা পানিতে ডুবে ও বজ্রপাতে মারা গেছেন।
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগত ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিটঘর ইউনিয়নের টিয়ারা গ্রামের রুবেল মিয়া। গত ৮ জুন দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত হওয়ার পর তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন।
২২ সেপ্টেম্বর পূর্বশত্রুতার জেরে খাগাতুয়া গ্রামের ইকবাল হোসেন (৪০) ভোরের বাজারে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে নবীনগর থানায় হত্যা মামলা হয়েছে।
২১ সেপ্টেম্বর বিদ্যাকুট গ্রামের সাত বছরের শিশু মিম আক্তার নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ের ঝোপ থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। হত্যার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের বিভিন্ন দল তদন্ত করছে।
১৬ আগস্ট সাতমোড়া গ্রামে গরু চুরির অভিযোগে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে কাজল মিয়া (৪৬) নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা হয়েছে। এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। নিহত কাজল মিয়ার বিরুদ্ধে নবীনগরসহ বিভিন্ন থানায় গরু চুরির চারটি মামলা ছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
১২ আগস্ট রতনপুর ইউনিয়নের মাঝিয়ারা গ্রামে পারিবারিক কলহের জেরে ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর লাথির আঘাতে পল্লিচিকিৎসক মামুন মিয়া (৪৫) মারা যান। এ ঘটনায় করা মামলায় একজন আসামি কারাগারে রয়েছেন।
১৬ জুন থোল্লাকান্দি গ্রামের রিফাত আহমেদ (২৮) নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর নরসিংদীর করিমপুর এলাকার রাসুলপুর জিরো পয়েন্টের শুটকিকান্দি বালুচর থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ মামলায় দুজন কারাগারে রয়েছেন।
১০ জুন বিটঘর ইউনিয়নের টিয়ারা গ্রামে আধিপত্য বিস্তার ও পূর্বশত্রুতার জেরে সংঘর্ষে আহত ইকবাল মিয়া (৬০) আট দিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।
১১ মে বড়িকান্দি ইউনিয়নের নতুন থোল্লাকান্দি গ্রামের রিমন মিয়া (২৫) নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর বাঞ্ছারামপুরের মরিচাকান্দি-উলুকান্দি এলাকার কলেজ রোডের পাশ থেকে তার গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় বাঞ্ছারামপুর থানায় মামলা হয়েছে।
২৬ এপ্রিল নবীনগর সদর বাজারের মনোবাবুর ঘাটে নৌকায় বসার স্থান নিয়ে দুই যাত্রীর হাতাহাতির সময় ঘুষির আঘাতে হানিফ মিয়া গুরুতর আহত হন। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি আপস-মীমাংসা হয়েছে বলে জানা গেছে।
৪ এপ্রিল পারিবারিক বিরোধের জেরে বিদ্যাকুট ইউনিয়নের মেরকুটা গ্রামের রহমত উল্লাহকে কোমল পানীয়ের সঙ্গে কীটনাশক মিশিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় করা মামলায় প্রধান আসামি হাসান মিয়া কারাগারে রয়েছেন।
১ এপ্রিল বিটঘর ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামের সেলুনকর্মী আতিকুর রহমান নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর স্থানীয় একটি পুকুর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তে মামলার রহস্য উদঘাটন করে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
১৮ ফেব্রুয়ারি জমি নিয়ে বিরোধের জেরে সাতঘরহাটি গ্রামে ছোট ভাইয়ের লাঠির আঘাতে বড় ভাই ইসমাঈল মিয়া নিহত হন। এ মামলায় দুজন কারাগারে রয়েছেন এবং তদন্ত চলছে।
২ ফেব্রুয়ারি বড়িকান্দি ইউনিয়নের থোল্লাকান্দি গ্রামের ১৭ বছর বয়সী মুস্তাকিম মুরাদকে পূর্ববিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ ওঠে। তিনি নরসিংদী সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে পাঠানো হয়েছে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নিয়ে জটিলতাএদিকে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেতে দেরি হওয়ায় নবীনগর থানার প্রায় ৫০টি মামলার তদন্ত কার্যক্রম ধীরগতিতে চলছে বলে স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এতে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পাঠাতে বিলম্ব হচ্ছে এবং বিচারপ্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোরশেদ আলম চৌধুরী পুলিশের দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কোনো ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। নিয়মিত অভিযানও চলছে। এরপরও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, পুলিশ অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে কারাগারে পাঠাচ্ছে। তবে মাদক মামলার অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে আবার মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।
আত্মহত্যার ঘটনা প্রসঙ্গে ওসি বলেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে এসব ঘটনা ঘটছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজের মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নিয়ে তিনি বলেন, হত্যা ও অপমৃত্যুর মামলায় চিকিৎসকের প্রতিবেদন সময়মতো না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পাঠাতে দেরি হয়। এতে আসামিরা জামিনে মুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।
সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা ও সচেতনতা প্রয়োজন বলেও জানান ওসি।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক