স্বর্ণের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যই এর বহুমুখী ব্যবহারের প্রধান কারণ। এটি সহজে ক্ষয় বা মরিচা ধরে না, বিদ্যুৎ পরিবহনে কার্যকর এবং অত্যন্ত পাতলা পাত বা সূক্ষ্ম তারে রূপ দেওয়া যায়।
খাবারেও ব্যবহৃত হয় স্বর্ণবিশুদ্ধতার কারণে বিশেষ ধরনের স্বর্ণ খাবারেও ব্যবহার করা হয়। সাধারণত ২২ থেকে ২৪ ক্যারেটের অত্যন্ত পাতলা স্বর্ণের পাত, গুঁড়া কিংবা ছোট টুকরা মিষ্টি, চকলেট, কেক, আইসক্রিম ও বিভিন্ন বিলাসবহুল খাবার সাজাতে ব্যবহার করা হয়। একে বলা হয় ‘এডিবল গোল্ড’ বা ‘গোল্ড লিফ’।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাবারে ব্যবহারের জন্য স্বর্ণকে ‘ই১৭৫’ নামে ফুড অ্যাডিটিভ হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মিষ্টি সাজাতে স্বর্ণ বা রুপার পাত ব্যবহারের দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে, যা সাধারণভাবে ‘ভারক’ বা ‘ওয়ার্ক’ নামে পরিচিত।
তবে খাবারে স্বর্ণ ব্যবহারে বিশেষ কোনো পুষ্টিগুণ পাওয়া যায় না। ধাতব স্বর্ণের দ্রাব্যতা খুব কম হওয়ায় এটি সাধারণত পরিপাকতন্ত্রে শোষিত হয় না। ফলে খাবারে এর ব্যবহার মূলত সৌন্দর্য ও বিলাসিতার জন্য।
২০২৩ সালে Particle and Fibre Toxicology জার্নালে প্রকাশিত ইঁদুরের ওপর ৯০ দিনের এক গবেষণায় ই১৭৫ ব্যবহারের পর লিভার, প্লীহা বা অন্ত্রে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অন্ত্রের জীবাণু ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। বেশি মাত্রায় স্বর্ণ গ্রহণকারী স্ত্রী ইঁদুরের ক্ষেত্রে হালকা অন্ত্রের প্রদাহও লক্ষ্য করা হয়েছিল।
স্মার্টফোন-কম্পিউটারের ভেতরেও স্বর্ণস্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রে অল্প পরিমাণ স্বর্ণ ব্যবহৃত হয়। সার্কিট বোর্ড, কানেক্টর, সুইচ ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সংযোগস্থলে এর ব্যবহার রয়েছে।
স্বর্ণের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ সহজে প্রবাহিত হয় এবং এটি সহজে ক্ষয় বা মরিচা ধরে না। ফলে দীর্ঘদিন বৈদ্যুতিক সংযোগ কার্যকর রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একেকটি যন্ত্রে স্বর্ণের পরিমাণ সামান্য হলেও বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদিত হওয়ায় এ খাতে স্বর্ণের সামগ্রিক ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। এ কারণে পুরোনো মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে স্বর্ণ পুনরুদ্ধার করে পুনরায় ব্যবহারের উদ্যোগও রয়েছে।
মহাকাশ প্রযুক্তিতে স্বর্ণের গুরুত্বমহাকাশ গবেষণাতেও স্বর্ণের ব্যবহার রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণ আলো ও তাপ বিকিরণ প্রতিফলিত করতে সক্ষম এবং দীর্ঘ সময়েও এর বৈশিষ্ট্য সহজে নষ্ট হয় না।
জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের আয়নাগুলোতে স্বর্ণের অত্যন্ত পাতলা প্রলেপ ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে ইনফ্রারেড আলো প্রতিফলনে স্বর্ণ কার্যকর হওয়ায় দূরবর্তী নক্ষত্র, ছায়াপথ ও মহাজাগতিক বস্তুর পর্যবেক্ষণে টেলিস্কোপটি এ সুবিধা পায়।
মহাকাশচারীদের হেলমেটের সামনের স্বচ্ছ অংশেও পাতলা স্বর্ণের প্রলেপ থাকে। এটি সানগ্লাসের মতো কাজ করে সূর্যের তীব্র ও ক্ষতিকর রশ্মি থেকে চোখ ও মুখ সুরক্ষায় সহায়তা করে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ পরিবাহিতা ও ক্ষয় প্রতিরোধের কারণে মহাকাশযানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও বৈদ্যুতিক সংযোগেও স্বর্ণ ব্যবহৃত হয়।
চিকিৎসায় স্বর্ণের নতুন সম্ভাবনাচিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বর্ণের ব্যবহারও বেশ পুরোনো। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের তথ্য অনুযায়ী, ‘গোল্ড সল্ট’ নামে পরিচিত কিছু স্বর্ণ যৌগ একসময় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে আরও কার্যকর ওষুধ সহজলভ্য হওয়ায় এ ব্যবহার অনেক কমেছে।
তবে আধুনিক চিকিৎসায় স্বর্ণ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ‘গোল্ড ন্যানোপার্টিকল’ ব্যবহার করে রোগ শনাক্তকরণ, নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এবং ক্যান্সার শনাক্ত ও চিকিৎসার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।
কিছু দ্রুত রোগ নির্ণয় পরীক্ষার কিটেও স্বর্ণের ন্যানোকণা ব্যবহৃত হয়। পরীক্ষার ফলাফল বোঝাতে কিটে যে দৃশ্যমান রঙিন রেখা তৈরি হয়, তাতেও এসব কণার ভূমিকা রয়েছে।
দাঁতের চিকিৎসাতেও স্বর্ণের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষয় প্রতিরোধী ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় দাঁত মেরামত বা পুনর্গঠনে স্বর্ণ ও স্বর্ণের সংকর ধাতু ব্যবহার করা হয়। তবে উচ্চমূল্য এবং বিকল্প উপকরণ সহজলভ্য হওয়ায় এ ব্যবহার বর্তমানে তুলনামূলক কম।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভেও স্বর্ণঅলংকার, প্রযুক্তি ও চিকিৎসার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও স্বর্ণ ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি স্বর্ণ মজুত করে আসছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে—প্রায় ৮ হাজার ১৩৩ টন। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৬ হাজার ৪০০ টন স্বর্ণ ছিল।
এদিকে গত কয়েক বছরে স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে চীন। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে দেশটির স্বর্ণের রিজার্ভ ছিল প্রায় ২ হাজার ২৭৯ টন। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে চীন আরও প্রায় ১৯ টন স্বর্ণ কিনেছিল। এর আগে ২০২৩ সালে দেশটি প্রায় ৮৮ টন স্বর্ণ কিনেছিল।
অর্থাৎ গয়না ও বিনিয়োগের পরিচিত ব্যবহারের বাইরে স্বর্ণ এখন প্রযুক্তি, মহাকাশ, চিকিৎসা, খাদ্য এবং বৈদেশিক রিজার্ভ—বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত একটি কৌশলগত ধাতু।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, নাসা, ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন, ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন এবং Particle and Fibre Toxicology।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক