মন্দিরটির নাম কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী শ্রীশ্রী দুর্গা ও কালীমন্দির। পাশেই রয়েছে পুরান বাজার জামে মসজিদ। স্থানীয় বাসিন্দা ও দুই উপাসনালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, যুগের পর যুগ ধরে এখানে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন। এ নিয়ে কখনো অপ্রীতিকর ঘটনার নজির নেই।
মন্দির আগে, পরে মসজিদ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরান বাজারে ১৮৩৬ সালে কালীমন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯১৫ সালের দিকে মন্দিরের পাশের একই আঙিনায় মুসলিম সম্প্রদায়ের নামাজ আদায়ের জন্য একটি ওয়াক্তিয়া মসজিদ নির্মাণ করা হয়। সময়ের পরিক্রমায় সেটি জুমার মসজিদে রূপ নেয়, যা বর্তমানে পুরান বাজার জামে মসজিদ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কালীমন্দিরের পাশে দুর্গামন্দির স্থাপিত হয়।
মন্দির ও মসজিদে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয় নিজ নিজ নিয়মে। আজান থেকে জামাতে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত মন্দিরে ঢাকঢোলসহ বাদ্যযন্ত্র বাজানো বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে মন্দিরের কার্যক্রম আবার স্বাভাবিকভাবে চলে। দুই সম্প্রদায়ের মানুষই পরস্পরের ধর্মীয় আচার পালনে সহযোগিতা করেন।
কালীবাড়ী এলাকার বাসিন্দা আমিরুল হায়াত মুকুল বলেন, ১৮৩৬ সালে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠার পর এলাকার নামকরণ হয় কালীবাড়ী। সেই থেকে একই উঠানে দুটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের কার্যক্রম চলছে। কখনো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
পূজারি দিলীপ চন্দ্র রায় বলেন, ‘লালমনিরহাটে ধর্মীয় সম্প্রীতির এটি একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যুগ যুগ ধরে এই সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ধর্মীয় উৎসব পালন করছি আমরা। সত্যি এটি আমাদের জন্য অনেক বড় গর্বের বিষয়।’
কালীবাড়ী মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম দুলাল বলেন, মন্দিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ধর্মচর্চা করতে পারেন, সে জন্য তারা সব সময় সহযোগিতা করেন। তাঁর মতে, একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দিরের অবস্থান শুধু লালমনিরহাট নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্য ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
পুরান বাজার জামে মসজিদের ইমাম আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, মসজিদের আগে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হলেও এখানে জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ স্বাধীনভাবে আসেন। উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরকে সহযোগিতা করেন। নামাজের সময় মন্দিরের বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা হয় এবং কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতির বন্ধন বজায় রয়েছে।
পুরান ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী আরিফ সাবেরী (৫৫), মনোয়ার হোসেন (৪৫) ও কমল চন্দ্র রায় (৪৮) জানান, একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির থাকার কথা শুনে তাঁরা দেখতে এসেছেন। দুই ধর্মের মানুষের দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দেখে তাঁরা মুগ্ধ।
মসজিদ ও মন্দিরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপাসনালয় দুটি একই আঙিনায় অবস্থিত হলেও জমির মালিক অন্য ব্যক্তি। মন্দিরের জমির পরিমাণ আট শতাংশ, মসজিদের পাঁচ শতাংশ এবং আঙিনার মোট জমির পরিমাণ ১২ শতাংশ বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
জেলায় ৪৭৬ মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন
এদিকে লালমনিরহাট জেলায় এবার ৪৭৬টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসব শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি হীরালাল রায় জানান, পূজামণ্ডপের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে প্রতিটি মণ্ডপে ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৪৭৬টি মণ্ডপের জন্য মোট বরাদ্দের পরিমাণ ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬০০ কেজি।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, জেলার পাঁচ উপজেলায় মণ্ডপের সংখ্যা হলো—লালমনিরহাট সদরে ১৬২টি, আদিতমারীতে ১১৭টি, কালীগঞ্জে ৯৩টি, হাতীবান্ধায় ৭৩টি এবং পাটগ্রামে ৩১টি।
জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিমা স্থাপন, সাজসজ্জা, আলোকসজ্জাসহ উৎসবের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। জেলা সদরের শ্রী গৌরিশংকর গোশালা সোসাইটি দুর্গামন্দির, কালীবাড়ী সর্বজনীন দুর্গামন্দির ও কাচারীবাড়ি সর্বজনীন দুর্গামন্দিরে প্রস্তুতি চলছে। একইভাবে আদিতমারীর মহিষখোঁচা ইউনিয়নের কামারপাড়া দুর্গামন্দির, কালীগঞ্জের তুষভাণ্ডার রাজবাড়ী সর্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গামন্দির, হাতীবান্ধা কেন্দ্রীয় শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দির ও সর্বজনীন দুর্গামণ্ডপ এবং পাটগ্রামের শ্রীশ্রী পাটেশ্বরী কেন্দ্রীয় দুর্গামন্দিরসহ বিভিন্ন মণ্ডপেও চলছে শেষ মুহূর্তের কাজ।
জেলা সদরের বড়বাড়ী বাজার শিবকালী ও দুর্গামন্দিরের সভাপতি নিমাই চন্দ্র পাল বলেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সভাপতি বাবু গুরুচরণ রায়ও প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত সহযোগিতায় উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, পূজামণ্ডপগুলোতে বিশেষ নজরদারি থাকবে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে। জেলা প্রশাসক মুহা. রাশেদুল হক প্রধান বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে জেলার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: লালমনিরহাট; স্থানীয় বাসিন্দা, মসজিদ-মন্দিরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের বক্তব্য।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক