পদ্মার বুকে তিন দিনের নৌকাবাইচ শেষ, উৎসবে জনস্রোত—নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৯ দুপুর
  • ৮০২৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহীর বাঘায় পদ্মা নদীর তীরে তিন দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা শেষ হয়েছে। শনিবার পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে নদীর দুই পাড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়লেও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকাগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

উপজেলার গড়গড়ি ইউনিয়নের বেঙ্গাড়ী বাজারসংলগ্ন পদ্মা নদীতে গত বৃহস্পতিবার এ আয়োজনের উদ্বোধন করা হয়। আয়োজক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবারের প্রতিযোগিতায় অর্ধশতাধিক নৌকার দল অংশ নেয়। প্রতিযোগীদের জন্য রাখা হয় এক লাখ টাকার পুরস্কার।

উদ্বোধন করেন রাজশাহী জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক এস এম সালাউদ্দিন আহমেদ শামীম সরকার। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদ। তিনি বলেন, সবার সহযোগিতায় বাংলার হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য উদ্‌যাপন সফল হয়েছে। এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাঁর পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

বৈঠার ছন্দে মাতল পদ্মার দুই পাড়

শনিবার দুপুরের পর থেকেই নৌকাবাইচ দেখতে পদ্মার দুই পাড়ে ভিড় করেন নারী-পুরুষ ও নানা বয়সী মানুষ। কেউ নদীর তীরে দাঁড়িয়ে, আবার কেউ নৌকায় চড়ে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন। কাঁসর-ঢোলের তালে এবং ‘নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে’ গানের সুরে বৈঠা হাতে মাঝি-মাল্লাদের ছুটে চলায় মুখর হয়ে ওঠে নদী।

প্রতিযোগিতায় সিরাজগঞ্জ থেকে আসা প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ হাত দীর্ঘ ‘বাংলার বাঘ’ ও ‘জনতা এক্সপ্রেস’ নামের দুটি নৌকা অংশ নেয়। নাটোরের লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের হুমায়ুন কবির ও হাফিজুর রহমান নৌকা দুটি ভাড়ায় নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে ‘বাংলার বাঘ’।

নৌকায় ওঠার আগে মাঝিদের মধ্যে আবেগঘন দৃশ্যও দেখা যায়। কেউ পানিতে ডুব দিয়ে, আবার কেউ নৌকায় মাথা রেখে মোনাজাত করে প্রতিযোগিতায় নামেন।

নৌকাবাইচ ঘিরে গ্রামীণ মেলা

নৌকাবাইচ উপলক্ষে বাঘা, চারঘাট, লালপুরসহ আশপাশের এলাকার মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসে গ্রামীণ মেলা। সেখানে মৃৎশিল্প, কাঁসা-পিতলের সামগ্রী, গৃহস্থালি পণ্য, শিশুদের খেলনা ও মিষ্টির দোকান বসে। দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য ছিল বিভিন্ন রাইড ও সার্কাসের আয়োজন।

মেয়ে ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নৌকাবাইচ দেখতে আসা রামচন্দ্রপুর গ্রামের মুনসুর রহমান বলেন, গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে নদী বাঁচানো জরুরি। নদী শুকিয়ে যাওয়া ও নাব্যতা হারানোর কারণে অনেক ঐতিহ্য আজ হুমকির মুখে পড়েছে।

খায়েরহাট গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী আব্দুল লতিফ মণ্ডল বলেন, ২০২৩ সালের পর তিন বছর বিরতি দিয়ে আবার মেলা বসেছে। নৌকাবাইচ দেখতে তাঁর বাড়িতে মেয়ে, জামাইসহ আত্মীয়স্বজন এসেছেন। এ আয়োজন এখন গ্রামবাসীর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

আয়োজক কমিটির সভাপতি তোয়াজ্জেম হক বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার শিকড়ের সংস্কৃতি তুলে ধরাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এবারের আয়োজন বড় জনসমাগমে রূপ নিয়েছে।

কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম ডাবলু সরকার জানান, আয়োজনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিএনপি নেতা মাসুদ করিম টিপু, জাহিদুল ইসলাম স্বপন ও ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম জনিসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

নৌকায় পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী না থাকার অভিযোগ

উৎসব নির্বিঘ্নে শেষ হলেও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকাগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সরেজমিন পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নৌকাগুলোর সঙ্গে অন্য নৌকার সংঘর্ষ কিংবা তীব্র ঢেউয়ে নৌকা ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও বাড়তি নিরাপত্তাসামগ্রী দেখা যায়নি।

সচেতন মহলের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা মনে করছেন, নৌকাবাইচের মতো বড় আয়োজনে আনন্দের পাশাপাশি প্রতিযোগী ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁদের পরামর্শ, প্রতিটি নৌকায় পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, উদ্ধারকর্মী ও উদ্ধার-সহায়ক সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নৌকার সঙ্গে মজবুত রশি এবং উপযুক্ত ভাসমান সরঞ্জাম রাখার ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে শুধু রশি বা খালি বোতল বেঁধে রাখাকে নিরাপত্তার বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। নৌকা ডুবে গেলে দ্রুত উদ্ধার নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী, উদ্ধারকারী নৌকা, লাইফ জ্যাকেট এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

বাঘা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেরাজুল হক বলেন, মেলা ও নৌকাবাইচ উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ এবং গ্রাম পুলিশের সমন্বয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

ঐতিহ্য রক্ষায় নিরাপত্তায় জোর

নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, আবেগ ও সামাজিক মিলনমেলার অংশ। এ আয়োজন নিয়মিত চালু রাখতে নদীর পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রতিযোগী ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ভবিষ্যতে আয়োজকদের সঙ্গে প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থার সমন্বয় বাড়ানো গেলে ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন আরও নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্র: আয়োজক কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, স্থানীয় দর্শনার্থী এবং বাঘা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad