সম্প্রতি প্রকাশিত নিজের বই You Don’t Need a Smartphone: A Practical Guide to Downgrading Your Phone and Upgrading Your Life-এ স্মার্টফোনের ব্যবহার কমানো এবং সাধারণ ফোনে অভ্যস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর মতে, স্মার্টফোনের কিছু সুবিধা হারানোর বিনিময়ে যে সময়, মানসিক প্রশান্তি ও সামাজিক সংযোগ ফিরে পাওয়া যায়, তা অনেক বেশি মূল্যবান হতে পারে।
সৃজনশীলতা ধরে রাখতে স্মার্টফোন ত্যাগকাজের তুলনায় ফোনের পর্দায় বেশি সময় কাটছে—এমন উপলব্ধি থেকে স্মার্টফোন ব্যবহারে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেন আগস্ট লাম। ২০২২ সালে নিজের ২৭তম জন্মদিনের পরপরই তিনি স্মার্টফোন ছেড়ে সাধারণ বাটনফোন ব্যবহার শুরু করেন।
শুরুতে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা কাজ করেছিল। পরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাওয়া কিংবা নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হারানোর আশঙ্কা ছিল তাঁর। কারণ, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সামাজিক আয়োজনের খবর জানার ক্ষেত্রে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন তিনি।
তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। লামের ভাষ্য অনুযায়ী, স্মার্টফোন ছেড়ে দেওয়ার পর বন্ধুদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বেড়েছে এবং পুরোনো সম্পর্কগুলো আরও দৃঢ় হয়েছে।
সরাসরি যোগাযোগে বেড়েছে আন্তরিকতালামের মতে, স্মার্টফোনের প্রতি মনোযোগ কমলে আশপাশের মানুষের প্রতি মনোযোগ বাড়ে। কারও সঙ্গে সময় কাটানোর সময় তখন পুরোপুরি সেই মুহূর্তে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়। বিপরীতে, স্মার্টফোন হাতে থাকলে মানুষের ভিড়েও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি বা ব্যক্তিগত খবর প্রকাশ করলেই তা লামের কাছে পৌঁছাবে—বন্ধুরা এমনটা আর ধরে নিতে পারেন না। ফলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ খবর জানাতে তাঁকে সরাসরি ফোন করতে হয় কিংবা সামনাসামনি কথা বলতে হয়।
প্রথম দিকে এ পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা অসুবিধা হলেও পরে এটি সম্পর্ক রক্ষার ইতিবাচক অভ্যাসে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবার সঙ্গে একযোগে তথ্য ভাগাভাগির বদলে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা সরাসরি বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়।
নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার পরিবর্তে তিনি সরাসরি দেখা করার পরিকল্পনা করেন কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান। এতে পরিচয়কে বাস্তব সম্পর্কের দিকে এগিয়ে নেওয়া সহজ হয়।
মানসিক চাপ সামলানোর বিকল্প অভ্যাসস্মার্টফোন ছেড়ে দেওয়ার প্রথম দিকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বা অসহায় মনে হতে পারে বলে স্বীকার করেছেন লাম। দীর্ঘদিন ডিজিটাল মাধ্যমে অভ্যস্ত থাকার পর নিজের অনুভূতি ও মানসিক অবস্থার মুখোমুখি হওয়াও কঠিন হতে পারে।
তবে সময়ের সঙ্গে তিনি মন খারাপ বা মানসিক চাপ সামলানোর বিকল্প উপায় খুঁজে পেয়েছেন। কোনো বন্ধুকে ফোন করা, বই পড়া, হাঁটতে বের হওয়া কিংবা গান শোনার মতো সাধারণ কাজ তাঁকে স্বস্তি দেয়।
তাঁর মতে, নেতিবাচক অনুভূতি এলেই তা থেকে দ্রুত মন সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের অনুভূতিকে বুঝতে শেখা এবং সেটির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মানিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়েও মানসিক প্রশান্তি অর্জন সম্ভব।
স্ক্রিনের বাইরে ফিরে পাওয়া যায় সময়লামের যুক্তি, কেউ যদি প্রতিদিন গড়ে পাঁচ ঘণ্টা স্মার্টফোনে স্ক্রল করেন, তাহলে এই অভ্যাস বন্ধ বা সীমিত করতে পারলে সেই সময়ের বড় একটি অংশ অন্য কাজে ব্যয় করা সম্ভব।
ফোনে বিল পরিশোধের পরিবর্তে সরাসরি সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যাওয়া, পোস্ট অফিসের কাজ করা কিংবা লাইব্রেরিতে গিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা নেওয়ার মতো কাজকে অনেকে বাড়তি ঝামেলা মনে করতে পারেন। কিন্তু তাঁর মতে, এসব কাজে অতিরিক্ত সময় খুব বেশি নাও লাগতে পারে। বরং বাইরে হাঁটাচলা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং বাস্তব পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তিনি মনে করেন, সময় অপচয়ের বিষয়টি সব সময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। একটি বার্তার উত্তর দেওয়া, এরপর খবর দেখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুঁ মারা—এভাবে ছোট ছোট বিরতি মিলেই দিনের কয়েক ঘণ্টা কেড়ে নিতে পারে।
স্মার্টফোন ব্যবহারের এই অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ব্যস্ত কর্মজীবনের মধ্যেও নিজের জন্য সময় বের করা সম্ভব বলে মনে করেন লাম। তাঁর অভিজ্ঞতায়, ফোনের প্রতি সার্বক্ষণিক মনোযোগ কমানোর ফলে অস্থিরতা ও আতঙ্কের অনুভূতিও কমেছে।
নিজের স্মৃতিশক্তি ও দক্ষতার ওপর আস্থাস্মার্টফোন ছাড়া চলতে গিয়ে তথ্য মনে রাখা কিংবা পথ চিনে নেওয়ার মতো দৈনন্দিন দক্ষতা নিয়েও নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন লাম। তাঁর মতে, এসব কাজে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমালে মানুষ নিজের স্বাভাবিক সক্ষমতার ওপর নতুন করে আস্থা রাখতে পারে।
তথ্য মনে রাখা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করা এবং পরিচিত পথ চিনে নেওয়ার মতো দক্ষতা মানুষের দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসের অংশ। কাগজে লেখার প্রচলন কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির বহু আগেই মানুষ এসব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করেছে।
লাম মনে করেন, স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পর নিজের মানসিক সক্ষমতা সম্পর্কে তাঁর ধারণা বদলে গেছে। একই অভিজ্ঞতা অন্যদের মধ্যেও দেখা যেতে পারে বলে তাঁর বিশ্বাস।
বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়ার গুরুত্বস্মার্টফোন ব্যবহারের সময় মানুষের মন প্রায়ই অন্য কোনো বার্তা, খবর কিংবা অনলাইন কার্যক্রমের দিকে পড়ে থাকে। ফলে সামনাসামনি কথোপকথনের সময়ও মনোযোগ বিভক্ত হয়ে যেতে পারে।
লাম বিষয়টিকে এমন এক অস্থিরতার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে কারও সঙ্গে কথা বললেও মনে হয় অন্য কোথাও জরুরি কিছু ঘটছে। তাঁর মতে, বাস্তবে উপস্থিত থাকার অর্থ হলো—যে মুহূর্তে আছেন, সেটিকে সম্পূর্ণভাবে অনুভব করা এবং অপ্রয়োজনীয় তুলনা বা তাড়াহুড়া থেকে দূরে থাকা।
এক মাস বাটনফোন ব্যবহার করে দেখার পরামর্শস্মার্টফোন ছাড়া জীবন কল্পনা করতে পারেন না—এমন ব্যক্তিদের অন্তত একবার বিকল্প ব্যবস্থাটি পরীক্ষা করে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন লাম। তাঁর মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এক মাস সাধারণ বাটনফোন ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে। চেষ্টা না করেই এই জীবনধারা অসম্ভব বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তবে চিকিৎসার প্রয়োজনে যাঁদের স্মার্টফোনে বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করা জরুরি, তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার কথাও বলেছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্য বাটনফোন ব্যবহার করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজে স্মার্টফোন সীমিত রাখা যেতে পারে।
লামের অভিজ্ঞতা থেকে মূল বার্তা হলো, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য; কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার যেন মানুষের সময়, মনোযোগ ও সম্পর্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করে। স্মার্টফোন পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া সবার জন্য প্রয়োজনীয় না হলেও এর ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর, ‘স্মার্টফোন ছাড়ার সিদ্ধান্ত আমার জীবনটাই বদলে দিয়েছে’, প্রকাশিত ১২ অক্টোবর ২০২৬। প্রতিবেদনটিতে আগস্ট লামের বই ও সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক