এমন পরিস্থিতিতে শুধু আয় বাড়ানোর চেষ্টা নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে খরচ নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি। এর জন্য জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে ফেলার দরকার নেই। বরং আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা, অপ্রয়োজনীয় খরচ চিহ্নিত করা এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সঞ্চয় করলে ধীরে ধীরে আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি করা সম্ভব।
সংসারের খরচ সামলে সঞ্চয় বাড়াতে অনুসরণ করতে পারেন সাতটি কার্যকর কৌশল।
১. মাসিক আয়ের সঠিক হিসাব রাখুনবাজেট তৈরির প্রথম ধাপ হলো পরিবারের মোট আয় নির্ধারণ করা। চাকরির বেতন, ব্যবসা, বাড়িভাড়া কিংবা অন্য কোনো নিয়মিত উৎস থেকে মাসে কত টাকা আসে, তার হিসাব রাখুন।
আয় অনিয়মিত হলে গত তিন থেকে ছয় মাসের গড় আয় হিসাব করতে পারেন। তবে বাজেট তৈরির সময় অনিশ্চিত আয়ের ওপর নির্ভর না করে নিশ্চিত আয়ের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা ভালো।
২. প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় খরচ আলাদা করুনবাড়িভাড়া, খাবার, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল, যাতায়াত, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা ও ঋণের কিস্তির মতো খরচের তালিকা তৈরি করুন। পাশাপাশি বাইরে খাওয়া, শখের কেনাকাটা ও বিনোদনের পেছনে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, সেটিও হিসাব করুন।
এরপর কোন খাতে ব্যয় কমানো সম্ভব, তা নির্ধারণ করুন। প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে পারলে সংসারের বাজেটে সঞ্চয়ের জন্য বাড়তি অর্থ রাখা সহজ হবে।
৩. প্রতিদিনের খরচ লিখে রাখুনছোট ছোট খরচের হিসাব না রাখলে মাস শেষে টাকা কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রতিদিনের বাজার, যাতায়াত, নাশতা ও অনলাইন কেনাকাটাসহ সব ব্যয় লিখে রাখুন।
এ জন্য খাতা-কলম, মুঠোফোনের নোট অ্যাপ কিংবা স্প্রেডশিট ব্যবহার করতে পারেন। মাস শেষে হিসাব পর্যালোচনা করলে কোন খাতে বেশি খরচ হচ্ছে এবং কোথায় কাটছাঁট করা সম্ভব, তা স্পষ্ট হবে।
৪. মাসের শুরুতেই বাস্তবসম্মত বাজেট করুনআয় ও ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী মাসের শুরুতেই একটি বাজেট তৈরি করুন। বাজার, যাতায়াত, চিকিৎসা, বিল ও অন্যান্য খাতে কত টাকা ব্যয় করবেন, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখুন।
বাজারে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা তৈরি করুন। এতে অপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার প্রবণতা কমবে। একইভাবে বাইরে খাওয়া, ঘোরাঘুরি ও শখের কেনাকাটার জন্যও নির্দিষ্ট সীমা ঠিক করুন।
তবে বাজেট এমন হওয়া উচিত, যা পরিবারের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নিয়মিত মেনে চলা সম্ভব।
৫. বেতন পাওয়ার পরই সঞ্চয় আলাদা করুনমাসের সব খরচ মেটানোর পর অবশিষ্ট টাকা সঞ্চয় করার পরিকল্পনা করলে অনেক সময় হাতে কিছুই থাকে না। এ সমস্যা এড়াতে আয় পাওয়ার পরই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আলাদা করে রাখুন।
সামর্থ্য অনুযায়ী আয়ের ১০ থেকে ২০ শতাংশ সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেন। তবে আয় কম হলে অল্প টাকা দিয়ে শুরু করাও কার্যকর। নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সঞ্চয়ের অর্থ দৈনন্দিন খরচের টাকা থেকে আলাদা রাখতে পারেন। এতে প্রয়োজন ছাড়া সেই টাকা খরচ করার প্রবণতা কমবে।
৬. জরুরি তহবিল গড়ে তুলুনঅসুস্থতা, চাকরি হারানো কিংবা হঠাৎ বড় কোনো ব্যয়ের জন্য জরুরি তহবিল থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সঞ্চয় না থাকলে ঋণ নেওয়া বা প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
ধীরে ধীরে এমন একটি তহবিল গড়ে তোলার চেষ্টা করুন, যাতে অন্তত তিন থেকে ছয় মাসের প্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো যায়। একবারে এত টাকা জমাতে না পারলেও নিয়মিত অল্প অল্প করে সঞ্চয় করুন।
জরুরি তহবিলের অর্থ নিরাপদ ও সহজে উত্তোলনযোগ্য স্থানে রাখুন। দৈনন্দিন কেনাকাটা বা বিনোদনের খরচে এই অর্থ ব্যবহার না করাই ভালো।
৭. নিয়মিত বাজেট পর্যালোচনা করুনএকবার বাজেট তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রতি মাসে আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করুন। কোনো খাতে নির্ধারিত সীমার বেশি খরচ হলে তার কারণ খুঁজে বের করুন।
দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া কিংবা পরিবারের প্রয়োজন পরিবর্তিত হলে বাজেটও নতুন করে সাজাতে হবে। পাশাপাশি সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, ঋণের কিস্তি কিংবা বড় কোনো কেনাকাটার জন্য আগেভাগে পরিকল্পনা করুন।
সঞ্চয় বাড়াতে আরও পাঁচটি অভ্যাসকেনাকাটার তালিকা করুন: প্রয়োজনীয় পণ্যের বাইরে বাড়তি কেনাকাটা এড়িয়ে চলুন।
দাম ও মান তুলনা করুন: একই পণ্য কেনার আগে বিভিন্ন দোকানের দাম যাচাই করুন।
অব্যবহৃত সাবস্ক্রিপশন বন্ধ করুন: ব্যবহার করেন না—এমন অ্যাপ ও অনলাইন সেবার খরচ বাদ দিন।
হুট করে কেনাকাটা এড়িয়ে চলুন: অপ্রয়োজনীয় কিছু কেনার ইচ্ছা হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছুটা সময় নিন।
পরিবারকে বাজেটে যুক্ত করুন: পরিবারের সদস্যদের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা জানালে খরচ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।
অল্প সঞ্চয়ও গড়ে তুলতে পারে আর্থিক নিরাপত্তাসঞ্চয় করতে হলে বেশি আয় করতেই হবে, এমন নয়। বরং আয় অনুযায়ী খরচের পরিকল্পনা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং নিয়মিত অর্থ জমা রাখার অভ্যাস আর্থিক স্থিতিশীলতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শুরুতে অল্প টাকা জমলেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। ধারাবাহিকভাবে সঞ্চয় করলে তা সময়ের সঙ্গে বড় অঙ্কে পরিণত হতে পারে। পরিকল্পিত সঞ্চয় ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি অনিশ্চিত সময়ে আর্থিক চাপ কমাতেও সহায়তা করে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক