বিশ্ব খাদ্য দিবস: খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত হোক সবার জন্য

  • মোঃ জাকির হোসাইন,সম্পাদক
  • আপলোড সময় : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৩ রাত
  • ৭৪৭৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য— “আজ উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি” (Innovate today. Nourish tomorrow)। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর উদ্ভাবনের মাধ্যমে সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে এবারের প্রতিপাদ্য।

খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, খাদ্য উৎপাদন বাড়লেই সবার পাতে খাবার পৌঁছে যায় না। খাদ্যের প্রাপ্যতা, ক্রয়ক্ষমতা, সুষম পুষ্টি এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত না হলে ক্ষুধামুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব নয়। তাই বিশ্ব খাদ্য দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়; এটি খাদ্যব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও উপলক্ষ। এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে যেমন রয়েছে খাদ্য উৎপাদনকারী কৃষক, তেমনি রয়েছে বাজারের সুশাসন এবং মানুষের খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করার সরকারি দায়িত্ব।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের কৃষক রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ধান, গম, শাকসবজি ও নানা ধরনের ফসল উৎপাদন করেন। তাঁদের শ্রমেই দেশের খাদ্যব্যবস্থা সচল থাকে। অথচ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সারের দাম, সেচ, জ্বালানি ও শ্রমিকের ব্যয় কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, কৃষক অনেক সময় তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান না; কিন্তু বাজারে সেই পণ্য কিনতে গিয়ে ভোক্তাকে দিতে হয় বেশি টাকা। উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে এই অসংগতি দূর করা জরুরি, কারণ কৃষকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত না হলে টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে উঠবে না এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাও সুরক্ষিত থাকবে না।

এই অসংগতির সরাসরি প্রভাব পড়ে খাদ্যের দামে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও সবজির দাম সংসারের হিসাব পাল্টে দেয়। আয় সীমিত থাকলে অনেক পরিবার প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার কিনতে পারে না। কেউ খাবারের পরিমাণ কমায়, কেউ পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে তুলনামূলক সস্তা খাবারের ওপর নির্ভর করে। এর প্রভাব পড়ে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে, শিক্ষার্থীদের মনোযোগে এবং কর্মক্ষম মানুষের উৎপাদনশীলতায়। ফলে খাদ্যসংকট কেবল ক্ষুধার সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই কৃষকের ন্যায্য মূল্য ও ভোক্তার সাশ্রয়ী দামে খাদ্যপ্রাপ্তি—দুটিকে পরস্পরবিরোধী না দেখে একই নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

এ লক্ষ্য পূরণে বাজারব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। খাদ্যপণ্যের সরবরাহ, মজুত, পরিবহন ও মূল্য নির্ধারণের ওপর নিয়মিত নজরদারি থাকতে হবে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুতদারি, কারসাজি এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণের নামে কৃষক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়রানি নয়; বরং প্রকৃত অনিয়মকারীদের শনাক্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে বাজারতথ্য স্বচ্ছ করা, কৃষককে ন্যায্য বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক প্রভাব কমানো জরুরি।

বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে কৃষিকে আরও টেকসই ও আধুনিক করাও প্রয়োজন। উন্নত বীজ, সাশ্রয়ী সেচ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকদের কাছে সহজলভ্য প্রযুক্তিগত পরামর্শ পৌঁছে দিতে হবে। উৎপাদনের পর ফসল সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, হিমাগার, উন্নত পরিবহন এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। সংরক্ষণ ও পরিবহনের দুর্বলতায় বিপুল খাদ্য নষ্ট হলে তার দায় শেষ পর্যন্ত কৃষক ও ভোক্তা—উভয়কেই বহন করতে হয়। তাই উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ফসলের অপচয় কমানো এবং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সংরক্ষণ করাও সরকারি নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

খাদ্যের অধিকার কেবল খাদ্য পাওয়ার অধিকার নয়; নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাওয়ার অধিকারও এর অন্তর্ভুক্ত। ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, দূষিত পানি এবং অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়ায় খাদ্য প্রস্তুত ও সংরক্ষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত পরিদর্শন, পরীক্ষাগারভিত্তিক যাচাই এবং আইন প্রয়োগ জোরদার করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি খাদ্য অপচয় কমানো, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

তবে বাজার ও খাদ্যনিরাপত্তার কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি যেসব মানুষ এখনই খাদ্যসংকটে রয়েছেন, তাঁদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হতে হবে প্রয়োজনভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক। দরিদ্র পরিবার, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ, প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠী এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে খাদ্যসহায়তা যথাসময়ে পৌঁছাতে হবে। উপকারভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রকৃত অসহায় মানুষ বাদ না পড়েন এবং অনিয়মের মাধ্যমে কেউ সুবিধা নিতে না পারেন। এ সহায়তা যেন সাময়িক ত্রাণে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং মানুষের আয়, পুষ্টি ও খাদ্যপ্রাপ্তির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত হয়।

বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আজকের উদ্ভাবন ও পরিকল্পনাই আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি। তবে প্রযুক্তি ও উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা কৃষকের আয় বাড়াবে, বাজারে স্থিতিশীলতা আনবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দেবে। অর্থাৎ উদ্ভাবনকে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধির উপায় হিসেবে নয়, কৃষক, বাজার ও ভোক্তার স্বার্থকে সমন্বিত করার মাধ্যম হিসেবেও দেখতে হবে।

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অপরিহার্য শর্ত। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ, বাজারে কার্যকর তদারকি, কৃষকের ন্যায্য মূল্য, খাদ্য অপচয় রোধ এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আর কোনো শৈথিল্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কৃষকের উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার পাতে খাবার পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। ক্ষুধামুক্ত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে কথার চেয়ে কার্যকর উদ্যোগই এখন বেশি জরুরি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad