ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানুষের আত্মত্যাগের ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় কোনো বিবেচ্য বিষয় ছিল না। রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিকের অধিকার সমান হওয়া উচিত।
মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের জেমসেন হলের পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে বাংলাদেশ পূজা উৎসব পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীসহ সরকারের মন্ত্রী ও বিএনপির নেতারা বক্তব্য দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। তখন কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে বৌদ্ধ কিংবা কে খ্রিষ্টান—তা বিবেচনা করে কেউ যুদ্ধে অংশ নেননি। একইভাবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও ছাত্র-জনতা, নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন।
তারেক রহমান বলেন, “স্বৈরাচারের গুলি কিন্তু দেখেনি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে খ্রিস্টান।” গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন বা আহত হয়েছেন, তাদের ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করে কেউ জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসেননি। আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা চিকিৎসা দেওয়ার সময়ও মানুষের জীবন বাঁচানোই ছিল প্রধান বিবেচনা।
তিনি বলেন, নাগরিকদের সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু পরিচয়ে আলাদা করে না দেখে সবাইকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘ ১৭ বছর বিদেশে অবস্থানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লন্ডনে থাকার সময় তিনি এমন পরিবেশে ছিলেন, যেখানে অন্য ধর্মের মানুষের সংখ্যা বেশি ছিল। এ অভিজ্ঞতা তাঁকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে আলাদা করে দেখার সীমাবদ্ধতা বুঝতে সহায়তা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই দেশের আইন আমার জন্য যেভাবে প্রযোজ্য, আপনার জন্যও একইভাবে প্রযোজ্য। এই দেশের ওপর আপনার যে অধিকার আছে, আমারও ঠিক সেই অধিকার রয়েছে।”
মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানুষের আত্মত্যাগের লক্ষ্য ছিল নিরাপদ, শান্তিময় ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা—এ কথা উল্লেখ করে তিনি সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা কামনা করেন।
‘কারও ভোটব্যাংক হবেন না’অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কোনো রাজনৈতিক দলের ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করার রাজনীতিতে তারা বিশ্বাস করেন না। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে অন্য সবার মতো তাঁদেরও সমান সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও আইনি অধিকার রয়েছে।
তিনি বলেন, “আপনারা কারও ভোটব্যাংক হবেন না। আপনারা বাংলাদেশেরই নাগরিক। এই দেশের স্বাধীন সব অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং অন্যান্য আইনি অধিকার আপনারাও অন্য নাগরিকদের মতো ভোগ করবেন।”
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজন নয়, বরং সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, সংস্কৃতি ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা এবং ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্গাপূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও এর আনন্দ অন্য ধর্মের মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে উৎসবের এই সর্বজনীনতা দীর্ঘদিনের উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক স্বার্থে এ সম্প্রীতিকে বিভাজনের মধ্যে ফেলার চেষ্টা হয়েছে।
সম্পত্তি দখলের অভিযোগ তুলে ধরলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসনাতন ধর্মাবলম্বীদের সম্পত্তি দখলের প্রসঙ্গ তুলে সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেন, ১৯৭২ সালের পর বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের শাসনামলে তাঁদের সম্পত্তি দখল করা হয়েছে। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে ভূমি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে কাজ করার সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখেছিলেন। তাঁর দাবি, সে সময় সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তাঁরা খুঁজে পাননি।
অতীতে যাঁদের সম্পত্তি দখল হয়েছে, তাঁদের অধিকার আদায়ে কথা বলা এবং দাবি তোলার আহ্বান জানান তিনি। বিএনপির জন্মের আগের ঘটনাগুলোর দায় দলটির ওপর বর্তায় না বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সব ধর্মের মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নিয়েছেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার সব নাগরিকের আস্থা অর্জন করতে চায়।
‘বিএনপিকে জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে অপপ্রচার’বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছর বিএনপিকে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থে দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
রিজভী বলেন, বিএনপি অতীতেও একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। কিন্তু দলটিকে জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে প্রচার চালানো হয়েছে। তাঁর মতে, ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য অতিরঞ্জিত প্রচার এবং মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়।
দুর্গাপূজার সর্বজনীনতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব হলেও এর আনন্দ অন্য ধর্মের মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণা করে রিজভী বলেন, বগুড়ায় তাঁর বাড়ির সামনে দুর্গাপূজা উপলক্ষে বড় মেলা বসত। সারা বছর তাঁরা সেই মেলার জন্য অপেক্ষা করতেন। এ ধরনের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধনের পরিচয় বহন করে।
ভারতীয় পর্যটকদের প্রশংসার প্রসঙ্গবাংলাদেশে দুর্গাপূজা দেখতে ভারত থেকে পর্যটকেরা এসেছেন উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বিভিন্ন ভিডিও ও সাক্ষাৎকার দেখা যাচ্ছে। সেখানে অনেকে বাংলাদেশে আনন্দমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপনের প্রশংসা করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
রিজভীর ভাষ্য, বিদেশি পর্যটকদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের একটি দিক তুলে ধরে। তবে অপপ্রচারের মাধ্যমে দেশের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষে রিজভী বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পারস্পরিক বন্ধন, ভ্রাতৃত্ব ও সহাবস্থানের ঐতিহ্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। ভবিষ্যতে যেন বিভেদ সৃষ্টির প্রচেষ্টা পুনরাবৃত্তি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ অন্য নেতারা।
তথ্যসূত্র: চট্টগ্রাম নগরের জেমসেন হলে বাংলাদেশ পূজা উৎসব পরিষদ আয়োজিত শারদীয় দুর্গোৎসবের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য। প্রকাশিত মূল প্রতিবেদন: ২১ অক্টোবর ২০২৬।

প্রথম দর্পণ,জাতীয় ডেস্ক